পোবনিউজ২৪, বেনাপোল, যশোর জুন ৩০, ২০২৬ : দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে দুর্নিতির মহাৎসব চলছে। আনসার সদস্য ও এক শ্রেণীর দুর্নিতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তার যোগসাজচে প্রতিনিয়তই চলছে বন্দর গোডাউন থেকে পণ্যচুরি ঘাপলা ও ঘোষণা বর্হিভূত মালামাল পাচারের হিড়িক। অবৈধ অস্ত্রও আসছে বলে মনে হচেছ। গত দুই সপ্তাহের ব্যাবধানে বেনাপোল বন্দরে পৃথক চারটি ঘটনায় ৬১ জনের নামে মামলা দায়ের হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্যের। তবে অধিকাংশ আসামীদের ধরতে পারেনি প্রশাসনের সদস্যরা। ঘাপলার সাথে জড়িতরা যাচ্ছেন পাড় পেয়ে।
পুলিশ ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা সুত্রে জানায়.বেনাপোল স্থলবন্দরে গত দু দিন আগে কাগজপত্রবিহীন একটি পণ্যবাহী ভারতীয় ট্রাক জব্দ করে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বাংলাদেশি ট্রাক ও চালককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়ে। একই সঙ্গে বন্দরের আনসার ও বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত দেখিয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।শনিবার (২৭ জুন) বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. ওবাইদুল মিয়া। বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি করেন।
বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানায়,আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে সরিষার খৈলবাহী একটি ভারতীয় ট্রাক গত ২৩ জুন রাত ৯টার দিকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। পরে ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৫ নম্বর শেডে খালাসের তথ্য দেখিয়ে বের করে নেওয়া হয়। ভারতীয় ট্রাকটি থেকে অবৈধ ৫০ বস্তা দামি শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস পণ্য ৩২ নম্বর ইয়ার্ডে একটি বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ভারতীয় ট্রাকটি বিকাল ৫টার দিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে প্রবেশ করলে সেটি আটক করা হয়। খবর পেয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামীর উপস্থিতিতে ট্রাকটি তল্লাশি করা হয়। পরে ট্রাকটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে ওজন করলে ঘোষিত ওজনের তুলনায় ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের ঘাটতি ধরা পড়ে। এ সময় ট্রাক থেকে ১৪০ বস্তা সরিষার খৈল ও ৫০টি খালি বস্তা জব্দ করা হয়। ঘটনার পর ভারতীয় ট্রাকচালক পালিয়ে গেলেও বাংলাদেশি ট্রাক ও এর চালককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়, পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রটি কৌশলে মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্টের নাম ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে কাস্টমস, বন্দর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক কাজী রতন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, তারা গেট পাস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ছাড়াই ট্রাক চলাচল ও পণ্য অপসারণে সহযোগিতা করেন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ব্যবহৃত বাংলাদেশি ট্রাকটি শনাক্ত করা হয় এবং ট্রাকচালক ও হেলপারকে আটক করা হয়।‘অপরাধ দমনে বন্দর কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বন্দরের নিরাপত্তাকর্মী ও ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্টদের ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অন্য কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে মামলায় যুক্ত করা হবে।
বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। তবে তদন্তের সার্থে আসামীদের নাম প্রকাশ করেনি বন্দর।
বন্দর ব্যাবহারকারিরা জানান প্রতিটি আমদানিকৃত ট্রাক প্রথমে বিজিবির তল্লাশি, এরপর কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ ওজন পরীক্ষা এবং সর্বশেষ উন্নতমানের স্ক্যানিং মেশিনে পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া বন্দরের প্রায় ৩৭৫টি সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি রয়েছে। এত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও অসাধু চক্রের একটি অংশ যোগসাজশ কিংবা নজরদারির ফাঁকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য প্রবেশ করাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বন্দরের বাণিজ্যিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এদিকে চলতি মাসে কাস্টমসের দায়ের করা পণ্য পাচারের আগের তিনটি মামলায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে বৈধ পথে আমদানিকৃত পণ্য পাচার ও অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের শেড থেকে আমদানিকৃত পণ্যপাচার ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আরও দুই মামলা দায়ের করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। নতুন এ দুই মামলায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি ও আমদানিকারকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। চলতি সপ্তাহে বন্দর থেকে দেড় কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পন্য পাচারের ঘটনায় কাষ্টম কর্মকর্তাসহ সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিজিবি। এ ঘটনায তিনজনকে আটক করে থানায় দেয় বিজিবি।
এর আগে সাত কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে আরও একটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। ফলে এক সপ্তাহে দায়ের হওয়া তিনটি মামলায় মোট ৪৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ভারত থেকে ৩২৬ কার্টুন কালার পেন্সিল, ওয়াটার কালার পেন্সিল ও ইরেজার (রাবার) আমদানির একটি চালান বেনাপোল বন্দরের ২৬ নম্বর শেডে প্রবেশ করে। ভারতের কোহিনুর এক্সপোর্ট এর রফতানি করা পণ্য চালানের আমদানিকারক টিএস ইন্টারন্যাশনাল। আমদানিকৃত বৈধ পণ্যচালানের সাথে অবৈধ অতিরিক্ত ৫০ কার্টুন উচ্চ শুল্ককর ভারতীয় পণ্য জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। যার মধ্যে রাজস্ব ফাঁকি দিতে ঘোষনা বহির্ভূত ৩০ কার্টুন উচ্চ মূল্যের বিভিন্ন দামি শাড়ি ও ২০ কার্টুন ফেসওয়াস আনা হয়। আমদানিকৃত পণ্যের সাথে ঘোষনা বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়ে আসার তথ্য পায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর পরেই পণ্য আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এর আগে, ১২ মার্চ ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি চালানে ‘বেকিং পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস আমদানি করে শাফা ইমপেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। পণ্যগুলো আটক করে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষণ করা হয়। কাস্টমস চালানটি আটক করে বন্দরের হেফাজতে রাখলেও পরে শেড ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে কোরবানী ঈদের ছুটিতে বন্দরের জিম্মায় রাখা সেই চালান থেকেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে দামি ভারতীয় পণ্য। তার বদলে রাখা হয়েছে অতি নিমমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য সামগ্রী। এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব পরিশোধে চরমপত্র দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নিজেদের দোষ ঢাকতে বন্দর কর্তৃপক্ষ তরিঘরি করে শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এছাড়া বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তারা কাজ শুরু করেছেন।
এর আগে ঢাকার ‘নুসরাত ট্রেডিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত একটি চালান ‘সিনথেটিকস ফেব্রিক্স অ্যান্ড লেস’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। চালানটির সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে বেনাপোলের ‘খাজা এন্টারপ্রাইজ’। পণ্য চালানটি ৩১ মার্চ বন্দরে প্রবেশ করে। পণ্যচালানটি বন্দরের ১৯ নম্বর শেডে আনলোড করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী প্যাকেজ সংখ্যা ছিল ২৬০টি। তবে গণনার সময় অতিরিক্ত ৭টি প্যাকেজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৭টি প্যাকেজে পাওয়া যায় ঘোষণাবহির্ভূত উন্নতমানের ভারতীয় শাড়ি। যার মধ্যে ২৫০টি মিডিয়াম মানের এবং ৪২৯টি গর্জিয়াস শাড়িসহ মোট ৬৭৯ পিস। ৫ এপ্রিল বেনাপোল স্থলবন্দরের ১৯ নম্বর শেডে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এক অভিযান পরিচালনা করে ঘোষণাবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। যার মাধ্যমে সরকারের প্রায় এক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে অভিযান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও বন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকেও ২৫ মেট্রিক টন পণ্য পাচার ও বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনায় গত ১৪ জুন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও কাজী নাঈম উদ্দীন পৃথক দুই মামলায় ২৪ জনকে আসামি করে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করেন। এর আগে ৯ জুন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহামুদুল আরেফিন আরও একটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করেন।
এদিকে কাস্টমসের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, বন্দর থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে বন্দর, কাস্টমস বা ব্যবসায়ী যারা জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, বন্দরের শেড থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। যে কোনো মূল্যে এ ধরনের অপরাধ দমন করা হবে।
বেনাপোল পোর্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, তিনটি মামলার আসামিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও বন্দর থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের যুগ্ম কমিশনার ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ রুবেল জানান, গত কয়েক মাসে আমদানি পণ্যে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য প্রবেশের সময় ১৪টি পণ্য চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিলো। রাজস্ব ফাঁকির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।






