পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ : পয়লা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতি তথা জাতিসত্তা উন্মোচনের এক বিশেষ দিন। বিগত ছয় দশকের মতো এই দিনে দেশের মানুষ সব গ্লানি, জরা মুছে ফিরে দেখে ফেলে আসা বছরকে। গত বছরেও রমনায় নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়েছে নববর্ষের অনুষ্ঠান। ১৬ ডিসেম্বর উন্মুক্ত মঞ্চে হলো বিজয় দিবসের আয়োজন। তার দুই দিন পরই গভীর রাতে ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবনে ভাঙা হারমোনিয়াম-তবলা-তানপুরা এবং নালন্দার ছিন্নবিচ্ছিন্ন শিশুপুস্তকের দুঃসহ স্মৃতি। সেই রাতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় দুই শীর্ষ সংবাদপত্র ভবনে। পরদিন আক্রান্ত উদীচী। এই সহিংস ঘটনাবলির কদিন আগেই অপদস্থ হয়েছেন বাউলশিল্পীরা। স্মরণে জেগে ওঠে এই বটমূলে ২০০১ সালের ভয়াবহ অঘটন। গোয়ালন্দে মৃত্যু নুরাল পাগলের লাশ কবর থেকে তুলে উল্লাস ও উন্মাদনা করে লাশ সহ তার আস্তানা পুড়িয়ে দেয় উৎসুক তৌহিদী জনতা।….এগুলোর সাক্ষীতো এই দেশের মানুষ। অত্যন্ত বিমর্ষ চিত্রে এই সংবাদদাতাকে কথাগুলো বললেন ছায়ানটের সভাপতি ডা: সারওয়ার আলী।
সারওয়ার আলী বলেন, যে সংগীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা-মিলন-বিরহ-সংকটের সঙ্গী, মুক্তিযুদ্ধ থেকে সব অধিকার অর্জনের অবলম্বন, সব ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে, কোনো অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সংগীত থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিরস্ত করতে চায়। তারা আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শিকড় বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত। সমাজে বেড়েছে অসহিষ্ণুতা। বেড়েছে আপন মত প্রকাশে দলবদ্ধ নিগ্রহের শঙ্কা।
মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করেন ছায়ানট সভাপতি। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি। শুনতে চাই, সমাজের অভয়বাণী যেন সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে প্রকৃত মত প্রকাশ করতে পারেন, সবাই যেন নির্ভয়ে গাইতে পারি, যেন সংস্কৃতির সব প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয় বাঙালি শঙ্কামুক্ত জীবন যাপন করে।’
সারওয়ার আলী বলেন, ‘এমন এক মাতৃভূমির স্বপ্ন দেখি, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির-জ্ঞান যেথা মুক্ত, গৃহের প্রাচীর।
অন্য বছরের মতো এবারও রমনা বটমূলে নতুন বছর বরণের এই প্রভাতি আয়োজন করে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট।
বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রভাত। ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা ১৫ মিনিট। পুব আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। আকাশে মেঘ থাকায় আলোটা শান্ত, আবছা। এমন পরিবেশে রাজধানীর রমনার বটমূলে বসে শতাধিক শিল্পী সম্মিলিত কণ্ঠে গাইলেন ‘জাগো আলোক-লগনে’। আর এভাবেই বরণ করে নেওয়া হলো বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩–কে। বর্ষবরণের এ আয়োজন দেখতে ভোর থেকেই আসতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। সময় যত গড়াতে থাকে, বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। একসময় মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ হয় বটমূল প্রাঙ্গণ। বটমূল ছাড়িয়ে রমনা পার্কের অন্য জায়গাতেও বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। সবাই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করতে থাকেন বাংলা নববর্ষ বরণের এই আয়োজন।
যদিও রমনার বটমুলে লোক সমাগম বাড়তে থাকে ততক্ষনে বাংলা বর্ষ বরণের মুল আয়োজন ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। দেশের সকল জেলা উপজেলা ইউনিয়ন পর্যায়ে বাঙগালীর প্রাণে জেগে ওঠে প্রাণের উচছাস । ঢাকার বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ। চট্রগ্রামে উদিচী শিল্প গোষ্ঠী সংগীত পরিবেশন করে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের মননে মানসিকতায় সেই উচছাস আর সে ভাবে ফুটে ওঠে না। চারুকলা ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বর্ষ বরণের সেই দিনগুলো স্মৃতির পাতায় এখনও অম্লান।






