পোবনিউজ২৪, ঢাকা ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ : ভৌগোলিক অবস্থান, বদ্বীপীয় ভূমি আকার, মৌসুমি জলবায়ু, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদী ভাঙন, খরা এবং ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন যাত্রার মানকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ ব্যাহত করে এবং ক্ষতি সাধন করে তাদের ঘরবাড়ি তথা অবকাঠামোর। এই প্রেক্ষাপটে, মানবিক দুর্ভোগ কমাতে এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য একটি সু-সংগঠিত এবং সক্ষম দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে” এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, তার শৃঙ্খলা, দক্ষতা, লজিস্টিক শক্তি এবং দেশব্যাপী উপস্থিতির মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তায় দেশের সবচেয়ে নির্ভযোগ্য সংস্থা হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। উদ্ধার অভিযান থেকে শুরু করে ত্রাণ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সহায়তা, প্রকৌশল কাজ, সামাজিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন জুড়ে তাদের অবদান দেশবাসীর কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আহবান করা হয়েছে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক দশকের যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে কার্যকর প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। সময়ের সাথে সাথে এবং সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন, সরঞ্জামের আধুনিকীকরণ এবং সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতির সাথে একীভূতকরণের মাধ্যমে তাদের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আইনত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত। দুর্যোগ সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ এর অধীনে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করে থাকে। এই কাঠামো সেনাবাহিনীকে অনুরোধের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়, যা দ্রুত মোতায়েন এবং সমন্বিত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম করে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতা তাদেরকে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ করে তুলেছে। অতিসাম্প্রতিক সময়ের কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিবরণ এবং সেগুলোর মোকাবেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানই তাদেরকে কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচ্য হতে সহায়তা করেছে।
২০২৪ সালের বাংলাদেশে বন্যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর মধ্যে একটি, যা মূলত দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে প্রভাবিত করেছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারত থেকে উজানের জলপ্রবাহের কারণে বন্যা শুরু হয়েছিল। এই বন্যা, বেশ কয়েকটি জেলাকে প্রভাবিত করেছিল, বিশেষ করে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ এবং হবিগঞ্জ জেলাকে। এই বন্যার ফলে ৭০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানী হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ৫৮ লক্ষ মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি, কৃষি এবং অবকাঠামো। একই বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমাল দক্ষিণ বাংলাদেশের উপর আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। প্রায় ৩৭ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।
বাংলাদেশে ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলির মধ্যে রয়েছে, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম। সাম্প্রতিক ভূমিধসের মধ্যে ২০১৭ সালের রাঙ্গামাটি-বান্দরবান ভূমিধস সবচেয়ে খারাপ দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত যেখানে মৃতের সংখ্যা ১৫০ জনেরও বেশি। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল হাজার হাজার ঘরবাড়ি এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছিল রাস্তাঘাট। সম্প্রতি ২৪-২৫ জুলাই ২০২৫ সালে, ভারী বর্ষণের ফলে ভোরে বাঘাইছড়ি-সাজেক সড়কের নন্দরাম এবং এর আশেপাশের স্থানে তিনটি পৃথক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এই ভূমিধসের ফলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে ৫০০ জনেরও বেশি পর্যটক ৯-১০ ঘন্টা পর্যন্ত আটকা পড়েন। এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের বিশেষায়িত দল, দক্ষতা, বেসামরিক প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। বন্যা কবলিত জেলাগুলিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বৃহৎ আকারে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে থাকে। ব্যবহৃত নৌকা, স্পিডবোট এবং হেলিকপ্টার, আটকে পড়া হাজার হাজার বেসামরিক লোককে উদ্ধার করে নিরাপদ
আশ্রয়ে স্থানান্তর করে। এই উদ্ধার অভিযানে নৌকা এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ৯.৫০০ বন্যার্তকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
এই দূর্যোগ এবং তাদের সামগ্রিক মোকাবেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির মধ্যে একটি হলো, যে কোন দুর্যোগে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিধস, ভবন ধস এবং অন্যান্য জরুরী অবস্থার সময়, সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রথম সংস্থা। দ্রুত/মূল কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সক্ষমতা গুলোর মধ্যে নিম্নের বর্ণণাকৃত সক্ষমতাগুলো অন্যতমঃ
বিশেষায়িত দুর্যোগ সাড়া প্রদানকারী দল: সেনাবাহিনী নিবেদিতপ্রাণ দুর্যোগ সাড়া প্রদানকারী এবং উদ্ধার ইউনিট গঠন করেছে, যাদের রয়েছে অনুসন্ধান এবং উদ্ধার কৌশল, ধসে পড়া কাঠামো উদ্ধার, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থাপনা এবং জরুরী স্থানান্তর, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নেভিগেশনের উপর উন্নত প্রশিক্ষণ। এই দলগুলি গ্রাম এবং শহরের উভয় পরিবেশেই কাজ করতে সক্ষম। তারা প্রায়শই ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে একসাথে কাজ করে থাকে।
আকাশ, জল এবং স্থলে গতিশীলতা; হেলিকপ্টার, নৌকা, স্পীডবোট এবং ভারী পরিবহন মোতায়েনে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা তাদেরকে প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর করে তোলে। বৃহৎ আকারের বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সময়, সামরিক হেলিকপ্টারগুলি বন্যাগ্রস্ত মানুষের মাঝে খাদ্য এবং চিকিৎসা সরবরাহ করে। জলযানগুলি আটকা পড়া পরিবারগুলিকে উদ্ধার করে।
আসন্ন দূর্যোগপূর্ব স্থানান্তর; দুর্যোগ আঘাত হানার পূর্বেই, সেনাবাহিনী স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় সেনাসদস্যরা উপকূলীয় জেলাগুলির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে হাজার হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করার জন্য কাজ করে। গতিশীলতা, জনবল এবং প্রশিক্ষণের সমন্বয় সেনাবাহিনীকে দুর্যোগের পরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।
ত্রাণ বিতরণ এবং মানবিক সহায়তা। প্রারম্ভিক উদ্ধার পূর্বের পর ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতপ্রতভাবে জড়িত। তাদের লজিস্টিক শক্তি নিশ্চিত করে যে ত্রাণ সামগ্রী দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায়। এজন্য তারা নিম্নে উল্লেখিত কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকেঃ
ত্রাণ শিবির/ক্যাম্প স্থাপন; সেনাবাহিনী বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য অস্থায়ী শিবির/ক্যাম্প স্থাপন এবং পরিচালনা করতে সহায়তা করে। এই ক্যাম্পগুলি আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন সুবিধা, খাদ্য সরবরাহ, নিরাপত্তা প্রদান করে থাকে। বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করে।
অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির বিতরণ: সেনাবাহিনী অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির মধ্যে খাদ্য (চাল, ডাল, শুকনো খাবার), বিশুদ্ধ পানি, পোশাক, ঔষধ, স্বাস্থ্যবিধি কিট, শিশুর খাবার বিতরণ করে থাকে। তাদের স্বচ্ছ এবং সুসংগঠিত বিতরণ ব্যবস্থা অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি হ্রাস করে। তারা নিশ্চিত করে যে, যাদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন তাদের কাছে সহায়তা যেন আগে পৌঁছে।
যোগাযোগ এবং সমন্বয় সহায়তা: দূর্যোগের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থারও ক্ষতি সাধিত হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক। বেসামরিক নেটওয়ার্ক ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী তাদের নির্দিষ্ট জনবলের মাধ্যমে (সিগন্যালস কোর) যোগাযোগ সহায়তা প্রদান করে থাকে। তারা নিশ্চিত করে যে, কোন রকম বাধা ছাড়াই মন্ত্রণালয়, এনজিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকে।
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা। দূর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা অবদান সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকার মধ্যে একটি। সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোর এই চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে জরুরী স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকে। এ জন্য তারা অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন করে যা বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা প্রদান করতে সক্ষম। এই হাসপাতালগুলি ট্রামা কেয়ার, জরুরী অস্ত্রোপচার, ঔষধ বিতরণ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ পরিষেবা প্রদান করে থাকে।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা: বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পরে, পানিবাহিত এবং ভেক্টর-বাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সে জন্য তারা টিকাদান অভিযান, পানি পরিশোধন অভিযান, দুষিত এলাকা জীবাণুমুক্তকরণ, ডায়রিয়া রোগের চিকিৎসা, মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
মহামারী মোকাবেলা; কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। কোয়ারেন্টাইন সেন্টার পরিচালনা, কোভিড আইসোলেশন ইউনিট পরিচালনা, স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে চলা নিশ্চিত করা, নিবেদিতপ্রাণ কোভিড হাসপাতাল পরিচালনা, পরীক্ষাগার এবং পরীক্ষার সহায়তা প্রদান বিশ্বব্যাপী সংকটের সময়ে তাদের সুশৃঙ্খল পদ্ধতি জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে।
প্রকৌশল ও অবকাঠামো পুনর্বাসন; দুর্যোগ পরবর্তী পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়শই মূল অবকাঠামোর ক্ষতি সাধন করে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত এই অবকাঠামো পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। প্রধান প্রকৌশল অবদানের মধ্যে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ এবং রাস্তা পুনরুদ্ধার। দুর্যোগের পরপরই, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলি পরিষ্কার করে গাছ বা ভূমিধসে অবরুদ্ধ রাস্তা, ধসে পড়া ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ লাইন। পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ত্রাণ যানবাহন এবং বেসামরিক পরিবহনের জন্য চলাচলের রাস্তা। অস্থায়ী ভাবে নির্মাণ করে বেইলি বিজ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা-প্রতিরোধী কাঠামো এবং প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ। স্থায়ী পূনর্গঠন/পূর্ণনির্মাণ শুরু না হওয়া পর্যন্ত এই অস্থায়ী সমাধানগুলি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠিকে সহায়তা করে থাকে।
পানি ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ: প্রকৌশল ইউনিটগুলি ভাঙা বাঁধ মেরামত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদীর তীর সুরক্ষা কাঠামো পুনরুদ্ধার, স্থির/বদ্ধ বন্যার পানি বের করে দেওয়ায় অবদান রাখে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সময় এই কাজগুলি বৃহত্তর ক্ষতি রোধ করে। তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা জাতীয় পুনরুদ্ধারের সময় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।
যে কোন দূর্যোগ মোকাবেলায় তার সম্পর্কে পূর্ব প্রস্তুত, প্রশিক্ষণ, জন সচেতনতা তৈরী করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে দূর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ কার্যক্রমেও নিম্নোক্তভাবে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখে।
প্রশিক্ষণ এবং মহড়া। সেনাবাহিনী দেশব্যাপী দুর্যোগ মহড়া, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি, ভূমিকম্পে কার্যকরী সাড়া প্রদান, অগ্নি নিরাপত্তা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরী স্থানান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই কার্যক্রমগুলি সরকারী সংস্থা, এনজিও এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে।
কমিউনিটি সচেতনতা কর্মসূচি: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপকূলীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে। বাসিন্দাদের শেখায় কিভাবে পূর্ব সতর্কবার্তায় সাড়া দিতে হবে, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করতে হবে, জরুরী সরবরাহ মজুদ করতে হবে, নিরাপদ পানীয় নিশ্চিত করতে হবে, গবাদি পশু এবং সম্পদ রক্ষা করতে হবে।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি কার্যক্রম; সেনাবাহিনী স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং যুব স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীর সাথে একত্রে কাজ করে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা এবং জাতিসংঘ মিশন; দেশের সীমানা পেরিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযান এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবিক কার্যক্রমের জন্য বহিঃবিশ্বে ব্যাপকভাবে সম্মানিত। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সেনাবাহিনীর অবদানগুলো হলোঃ সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দুর্যোগ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম, শরণার্থীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ক্যাম্প নির্মাণ, বাস্তচ্যুত সম্প্রদায়ের পুনর্বাসন, মাইন অপসারণ এবং অবকাঠামো মেরামত। বাংলাদেশ
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বিশ্বের বৃহত্তম অবদানকারী দেশগুলির মধ্যে একটি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের সহানুভূতি এবং পেশাদারিত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়ে আসছে।
যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য সেগুলো হলো তাদের শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্ব, দেশব্যাপী উপস্থিতি, ত্বরিত সেনা সমাবেশের সক্ষমতা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা, চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে কাজ করার ক্ষমতা, সরকারি মন্ত্রণালয়ের সাথে দুঢ় সমন্বয়, জনসাধারণের প্রচন্ড আস্থা এবং গ্রহণযোগ্যতা। তাদের সম্মিলিত মানবিক এবং লজিস্টিক ক্ষমতা তাদেরকে বাংলাদেশের দুর্যোগ সাড়াদানকারী ব্যবস্থাপনার স্তম্ভ করে তুলেছে।
বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করে থাকে। দ্রুত উদ্ধার অভিযান থেকে শুরু করে ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, প্রকৌশল কাজ এবং সাধারণ জনগোষ্ঠিকে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করার মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে দেশ যেন ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে কার্যকরভাবে মোকাবিলা এবং পুনরুদ্ধার করতে পারে। রোহিঙ্গা আগমন এবং কোভিড-১৯ মহামারী সহ জাতীয় সংকটের সময় তাদের অবদান কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয় বরং একটি মানবিক সংস্থা হিসেবে তাদের গুরুত্বকে আরও বেশী তুলে ধরেছে। জলবায়ুর বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিতে থাকা এই দেশে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আশার প্রতীক হিসেবে জনজীবনে স্তম্ভের মতো দাড়িয়ে রয়েছে। তাদের অক্লান্ত সেবা জাতীয় স্থিতিস্থাপকতাকে শক্তিশালী করে এবং নিশ্চিত করে যে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ এর যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
লেখক পরিচিতি:
কর্নেল মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন, পিএসসি, ১৯৯৮ সালের ১১ জুন ৩৮ বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে কোর অফ অর্ডন্যান্সে কমিশন লাভ করেন। তিনি অর্ডন্যান্স ইউনিটের সকল রেজিমেন্টাল পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যামিউনিশন প্লাটুন এবং ডিভিশন অর্ডন্যান্স কোম্পানির কমান্ড করেছেন। তিনি একটি ফরমেশন এবং এএইচকিউ অর্ডন্যান্স ডিরেক্টরেটে অর্ডন্যান্স সার্ভিসের সহকারী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক। তিনি সুদানের ইউএনএমআইএস-এ এটিও (ATO), লাইবেরিয়ার ইউএনএমআইএল-এ লজিস্টিক অফিসার এবং দক্ষিণ সুদানের এফএইচকিউ, ইউএনএমআইএসএস-এ এসএটিও (SATO) হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ডিরেক্টরেট জেনারেল ডিফেন্স পারচেজ (ডিজিডিপি)-তে ডেপুটি ডিরেক্টর পারচেজ হিসেবে কর্মরত আছেন।
nasiruddin5705@yahoo.com






