পোবনিউজ২৪ ঢাকা, জুন ২৪, ২০২৬ : ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ’কথিত বাংলাদেশি’ তকমা জুড়ে দিয়ে ঠেলে দেওয়ার নানামুখি ঘটনা সামনে এসেছে চলতি ২০২৬ সালের মে-জুন মাসের এ পর্যন্ত। সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ বিজিবি ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিএসএফের কথিত ঠেলে দেওয়াদের সব মানুষগুলোকেই ফেরত নিয়ে গেছে বিএসএফ শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদ সীমান্তে বাদে যেটি বাংলাদেশ কর্তৃক শনাক্ত । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন যা তার সঠিক তথ্য কোন পরিসংখ্যান ও অনুসন্ধানে বিশ্লেষন করে সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তার দাবি ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশিকে ভারতে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতি, বিজিবির প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য সরকারি তথ্য বা নথি নেই।
বরং মে-জুন ২০২৬ জুড়ে যে ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজিবি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কথিত ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে।
বিজিবি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মে-জুন ২০২৬ সময়কালে নিম্নোক্ত সীমান্ত এলাকাগুলোতে পুশইনের অভিযোগ উঠে। এলাকাগুলোর বিশ্লেষনমুলক তথ্যগুলো এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
ঝিনাইদহ সীমান্ত: রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝিনাইদহ সীমান্তে বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে ৩০-৩৫ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। বিজিবি বাধা দিলে তারা প্রবেশ করতে পারেনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বঙ্গাবাড়ী সীমান্ত: ৪ জুন বিএসএফ ২৮ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। বিজিবি বাধা দেয়। পরে তারা শূন্যরেখায় আটকা পড়ে থাকে।
লালমনিরহাট সীমান্ত: তিনটি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে ৩৩ জনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়। বিজিবি প্রতিরোধ করে।
পঞ্চগড় সীমান্ত: বিজিবি একাধিক পুশইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। কয়েক ডজন নারী-শিশু শূন্যরেখায় অবস্থান করে।
নওগাঁ সীমান্ত: উত্তরাঞ্চলের সমন্বিত অভিযানে বিজিবি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করে।
মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত: সাতজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি বাধা দেয়।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-গেদে সীমান্ত: ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবির অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সাতক্ষীরা-সুন্দরবন উপকূলীয় নদীপথ: স্থলসীমান্তের পাশাপাশি নদীপথ ব্যবহার করেও ১৫-২০ জনকে ঢোকানোর চেষ্টা হয় বলে বিজিবি জানায়। বিজিবির টহলে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি তাদের গ্রহণ করেছে?
অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রে উত্তর হলো না। বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করেনি। শুন্য রেখা থেকে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
বিজিবি প্রকাশ্যে বলেছে, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণ করা হবে না। বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, প্রত্যাবাসন হলে তা দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সীমান্ত প্রটোকল মেনে হতে হবে।
জুনের প্রথম সপ্তাহে বিজিবি ২৪ ঘণ্টায় ১০টি পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানায়। এসব ক্ষেত্রে কাউকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে ১১ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে বিজিবির বাধার মুখে বিএসএফ তাদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাট সীমান্তেও বহু মানুষ শূন্যরেখায় আটকা থাকলেও বিজিবি তাদের বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি।
এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত একটি ঘটনায় দেখা যায়, মুর্শিদাবাদ সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে ফেরত পাঠানোর আগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা জানায়। এটি ছিল আনুষ্ঠানিক যাচাই ও সমন্বয়ভিত্তিক প্রত্যাবাসন যেটি ”পুশইন” নয়। অর্থাৎ যে ঘটনাগুলো নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি বরং বিজিবি প্রতিরোধ করেছে।
প্রশ্ন হলো শুভেন্দু অধিকারীর ১০ হাজারের দাবি কতটা নির্ভরযোগ্য?
এ পর্যন্ত বিএসএফ কোনো প্রকাশ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি যেখানে ১০ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর তথ্য রয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এমন কোনো যাচাইকৃত সংখ্যা প্রকাশ করেনি। বিজিবির নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই সংখ্যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, আল জাজিরা ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও ১০ হাজারের দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে ১০ হাজারের সংখ্যা বর্তমানে রাজনৈতিক দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যাচাইকৃত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়।
মে ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সীমান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো বিএসএফের একাধিক কথিত পুশইন প্রচেষ্টা বিজিবি প্রতিহত করেছে। ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা সীমান্তে এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এসব ব্যক্তিকে গ্রহণ করেনি বরং শূন্যরেখায় আটকে রাখা হয়েছে বা বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে ১০ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর দাবি বর্তমানে মাঠপর্যায়ের তথ্য ও প্রকাশ্য সরকারি নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিজিবি’র এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ”২০২৬ সালে একজনও অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে পারেনি। বিজিবি খুবই তৎপর রয়েছে সীমান্ত রক্ষায়”। উল্খেযোগ্য সীমান্ত হলো ’সাদিপুর সীমান্ত’। ওই এলাকা দিয়ে একাধিকবার পুশইন বা বিএসএফ কর্তৃক ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু বিজিবির প্রতিরোধের কারণে তা সফল হয়নি। বুধবার দুপুরে দেবল কুমার দাস নামক দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বেনাপোল প্রতিনিধির সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কখা হলে তিনি জানান পুশ ইন ব্যাক বা বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টার ঘটনা এই সীমান্তে নেই বিজিবি’র টহল খুবই জোরদার রয়েছে।





