পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ২২ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশে প্রায় ১৭ বৎসর পর পর তিনবার ক্ষমতায় থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (২৩ জুন) পালনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের ডাক দিলেও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্ভাব্য সংঘাত, নাশকতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগরসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে পতাকা উত্তোলন, ব্যানার নিয়ে মিছিল এবং সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, বিশেষত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামি ছাত্র শিবির ও ছাত্রদল কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও গোপন বৈঠকের তথ্য পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দলটির সমর্থকরা প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করতে পারে।
ডিএমপির পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর ২০০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ঢাকা শহরের সব প্রবেশপথে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিটিটিসি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা ইউনিট মাঠে কাজ করবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনামূলক প্রচারণা বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সেনাবাহিনীকে ”এইড টু সিভিল পাওয়ার” বা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সেনা সদস্যরা মোতায়েন থাকবেন।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এই প্রতিনিধিকে বলছেন, সেনা মোতায়েনের অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; বরং এটি একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেনা মোতায়েন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার গভীরতাও নির্দেশ করে।
উল্লেখ্য যে, বালাদেশ আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের সিদ্ধান্তে নিষিদ্ধ করা হয় । বাংলাদেশ আওয়ামি লিগের নিবন্ধন সরাসরি বাতিল করা হয়নি, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক দলটির যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিরুদ্ধে চলমান বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং এর পরপরই নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই স্থগিতাদেশের ফলে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দলটির অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রম, সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচার-প্রচারণা সবই নিষিদ্ধ।
এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের ঘোষণা কতটা বৈধ সেই প্রশ্ন উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক স্মরণানুষ্ঠান এবং সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে পার্থক্যও বিবেচনায় আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে মূল লড়াই এখন সাংগঠনিক অস্তিত্বের। নিষিদ্ধ অবস্থায়ও দলটি তার সমর্থকদের কাছে বার্তা দিতে চায় যে সংগঠনটি এখনও সক্রিয়। অন্যদিকে সরকার ও প্রশাসন দেখাতে চায় যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ২৩ জুন শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র বনাম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য সংঘর্ষ, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানিমূলক পোস্ট ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতীতে বাংলাদেশে অনলাইন প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে সহিংসতার উদাহরণ রয়েছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ২০২৬ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।






