পোবনিউজ২৪, কুষ্টিয়া, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ : ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—বাউলসম্রাট লালন শাহের এই চিরন্তন দর্শনকে ধারণ করে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়ায় বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার প্রাঙ্গণে শনিবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব, সাধুর হাট ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা, যা ভক্তদের কাছে ‘পাগলের মেলা’ নামে পরিচিত। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব চলবে সোমবার পর্যন্ত। লালন একাডেমির উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়েছে।
লালনের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মরমি সংগীতের টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেউড়িয়ায় সমবেত হয়েছেন সাধু-ফকির, বাউল ও অসংখ্য ভক্ত। বাংলাদেশ ছাড়াও ইতালি, ফ্রান্স, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন লালন অনুসারীরা। তাঁদের উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে দেশ-বিদেশের ভক্তদের মিলনমেলায়।
উৎসবকে কেন্দ্র করে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সাধুসঙ্গ, আলোচনা সভা ও লালনসংগীতের আসরে মুখর হয়ে উঠেছে লালনধাম। গ্রামীণ মেলায় বসেছে নানা পণ্যের পসরা।
লালনের দর্শনে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার আহ্বান রয়েছে। তাঁর গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম ও সম্প্রীতির যে বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, তা আজও মানুষকে টানে। সেই দর্শনের টানেই প্রতিবছর ছেউড়িয়ায় ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের ভক্তরা।
তিন দিনের এ আয়োজন কেবল স্মরণোৎসব নয়; লালনের মানবধর্ম, মরমি সাধনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন-হাসান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী লালন সাধক ও ভক্তদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, লালন সাধকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালন দর্শন ও সাধনাকে ধারণ করে আসছেন। লালনের দর্শন আমাদের মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়।
নিতাই রায় চৌধুরী কুষ্টিয়ায় ‘লালন নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, লালনের স্মৃতি ও দর্শনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।
তিনি গড়াই-মধুমতী নদীতে নৌকাবাইচসহ দেশীয় খেলাধুলা, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে উৎসাহিত করতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত লালনসংগীতের আসর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গান উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। দীর্ঘ ঐতিহ্য ও প্রাণের টানে যুগ যুগ ধরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে লালনমেলা। বাউলসম্রাটের ভক্ত-অনুসারী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ মেলায় অংশ নেন। বাউলগান, একতারার সুর এবং সাধক-অনুরাগীদের মিলনে মুখর হয়ে ওঠে লালন একাডেমি চত্বর। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’—দেহ, মন ও আত্মার রহস্য অনুসন্ধানের এমন মরমি গানে মুখর হয়ে উঠেছে লালনের আখড়া।





