মীর আফরোজ জামান, পোবনিউজ২৪ ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ : ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উৎসবের আমেজে শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এ উৎসব চলবে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পর্যন্ত। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে রাজধানীসহ সারা দেশের মন্দির ও পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ, প্যান্ডেল সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে জনপদে জনপদে।
এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। বিপুলসংখ্যক মণ্ডপে পূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করেছে সরকার। একই সঙ্গে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ সরকারি চাকরিজীবীরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাচেছন।
উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। আনসার-ভিডিপির ২ লাখ ১২ হাজার ৮৩৪ সদস্য মোতায়েনের তথ্য জানিয়েছে সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনী যেমন বিজিবি, সেনাবাহিনী নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে বাড়তি নজরদারি, টহল, প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় নজরদারির পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জনের সময়ও নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। বিসর্জনকেন্দ্রিক জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নজরদারির প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি ও অপপ্রচার ঠেকাতে সাইবার নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎসবের আনন্দ অক্ষুণ্ন রাখা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ বছর সরকারি ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর সরকারি ছুটি থাকবে। এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পাবেন। তবে ১৭ অক্টোবর শনিবার সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পূজা উদযাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতারা। তাঁদের মতে, বাড়তি ছুটির ফলে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উৎসব উদযাপন, গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে বিশেষ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা ও বিজয়া শোভাযাত্রার মতো আয়োজন থাকছে। তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও উৎসব ঘিরে বাড়তি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া থাকছে রামকৃষ্ঞ মিশনের বিশেষ আয়োজন।
পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগম হবে। প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি, প্রসাদ গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে শারদীয় উৎসব। পূজার আনন্দ যেন সবার জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়, সে জন্য আয়োজক ও দর্শনার্থীদেরও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ উৎসব হয়ে ওঠে মিলন, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার উপলক্ষ। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপগুলোতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
সব মিলিয়ে, ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন, বাড়তি সরকারি ছুটি এবং বিস্তৃত নিরাপত্তা প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ভক্তদের প্রত্যাশা, প্রার্থনা ও আনন্দের এই উৎসব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে। দুর্গোৎসবের আলোয় আরও দৃঢ় হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক আস্থার বন্ধন।






