পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ২১ আগষ্ট ২০২৬ : বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি হয়ে ওঠা এ ’সজ্জন’ রাজনীতিক এবার আসীন হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেন তিনি। শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ কয়েকশ অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ পদত্যাগ করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পরে হওয়া এ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ভোট পান ২৫৫টি। তার প্রতিদ্বদ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের বাক্সে ভোট পড়ে ৮৮ ভোট।
শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দরবার হলে প্রবেশ করেন । দরবার হলের মঞ্চে নিজ আসনের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডদলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
তখন রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার কায়সার কামাল। শপথ গ্রহণ শেষে নতুন রাষ্ট্রপতি ও বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিজেদের আসন পরিবর্তন করে বসেন।
শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিনী সৈয়দা শামিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান।
প্রথম সারিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সংসদের বিরোধী দলীয় দলের নেতা শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকেও দেখা গেছে।
দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম।
এই সারিতে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ছিলেন অতিথিদের কাতারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ছিলেন। তিনি সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার পিতার নাম মির্জা রুহুল আমিন ও মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। শিক্ষাজীবনে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) একজন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এস.এম. হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির ৫ম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে তিনি ১৬ বছর দায়িত্ব পালনের পর বিএনপির মহাসচিবের পদ লাভ করেন।





