পোবনিউজ২৪, ঢাকা ১৭ আগষ্ট : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে শেষ মুহূর্তে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে সফরের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও ঢাকা এখন স্পষ্ট করে বলছে—দিল্লি সফরের আগে সম্পর্কের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। ফলে সম্ভাব্য ২০ থেকে ২৫ আগস্টের সফরটি শেষ পর্যন্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আটকে নেই; এর পেছনে রয়েছে গত দুই বছরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় ভারতের একাধিক কূটনৈতিক ভুল হিসাব। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া, ভারতের মাটি থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ তৈরি হওয়া, এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে দিল্লির ধীরগতি—এসব বিষয় দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। একই বৈঠকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
এর মাত্র কয়েক দিন পরই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বাংলাদেশ। ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম জানান, ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি জানান, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে ঢাকার অনুরোধের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
অর্থাৎ দিল্লি সফর এখন আর নিছক সৌজন্য সফর নয়। এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ঢাকার অভিযোগ, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকার তাঁর বক্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে অভিহিত করে। একই সঙ্গে ভারতকে জানানো হয়, বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এরপরই তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। ভারতের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এমন দাবিও এসেছে যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অগ্রগতি না হলে তারেক রহমান দিল্লি সফরে যেতে অনাগ্রহী। তবে এ বিষয়ে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে এমন শর্ত ঘোষণা করেনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের গভীরতা ও নতুন সরকারের জনমতভিত্তিক অবস্থানকে দিল্লি যথেষ্ট দ্রুত বুঝতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর সরকারের সময় নিরাপত্তা, সীমান্ত, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় দিল্লি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই পুরোনো সমীকরণ বদলে যায়।
নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির সামনে ছিল দ্রুত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং সব পক্ষের সঙ্গে আস্থার যোগাযোগ তৈরি করার চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনা ইস্যু বারবার সামনে চলে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভারতের প্রচেষ্টা একদিকে এগোলেও অন্যদিকে পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের ছায়া সেই উদ্যোগকে দুর্বল করেছে।
ভারতের কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনার আরেকটি বিব্রতকর ঘটনা ঘটে জুন মাসে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর ভারত প্রবেশ না করেই ঢাকায় ফিরে আসেন। বাংলাদেশ ঘটনাটির প্রতিবাদ জানায় এবং ভারতের ব্যাখ্যাকে ‘অসন্তোষজনক’ বলে উল্লেখ করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল, বিমানবন্দরে তাঁর ভ্রমণের উদ্দেশ্য যাচাইয়ের পর তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তিনি নিজেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনাটি হয়তো কাগজে-কলমে একটি প্রোটোকল বা অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব ছিল বড়। কারণ তখনই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছিল। ফলে ঘটনাটি নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভারতের আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করে।
ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, নদীর পানি, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে তারেক রহমানের সরকারও ভারতকে বাদ দিয়ে কোনো স্থায়ী আঞ্চলিক নীতি নিতে চায়—এমন ইঙ্গিত নেই। বরং ঢাকা বলছে, ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ যদি ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, কিন্তু সমমর্যাদার প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে ভারতের পুরোনো ‘নিরাপত্তা-প্রথম’ বা প্রভাবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে আরও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কূটনীতি প্রয়োজন—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।
তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে চীন সফর করেছেন এবং অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ভারতকে এড়িয়ে চীন ও মালয়েশিয়ায় হওয়াও দিল্লির জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অবশ্য এটিকে সরাসরি ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্বার্থে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু দিল্লির জন্য বার্তাটি পরিষ্কার—ঢাকা এখন আর কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি চায় না।
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত দিল্লি গেলে আলোচনায় আসতে পারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ; সীমান্ত হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা; বাণিজ্য ও বাণিজ্য ঘাটতি; জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা; ট্রানজিট ও আঞ্চলিক যোগাযোগ; পানি বণ্টন; তিস্তা ও গঙ্গার পানি; নিরাপত্তা ও সীমান্ত সহযোগিতা; বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ; উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ।
বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় পানি ইস্যুটি আগামী কয়েক মাসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্ন হচেছ
ভারত কি কূটনৈতিক সুযোগ হারাচ্ছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।
দিল্লির সামনে এখনো সুযোগ আছে। তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক হলে দুই দেশের নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারবে। ভারতের জন্য এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সুযোগ। একইভাবে ঢাকার জন্যও দিল্লির নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগ বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু সফরটি যদি বারবার পিছিয়ে যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর স্থগিত হওয়া হবে না; এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের জন্য আরও বড় ঝুঁকি হলো—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা যদি অন্য কোনো শক্তি ধীরে ধীরে পূরণ করতে শুরু করে, তাহলে শুধু রাজনৈতিক প্রভাব নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’—কতটা যৌক্তিক?
তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত হওয়ার পুরো দায় একতরফাভাবে ভারতের ওপর চাপানো ঠিক হবে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শেখ হাসিনা ইস্যু, জনমতের চাপ এবং নতুন সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে কূটনীতির মূল পরীক্ষা হলো পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া। সেই জায়গায় দিল্লির কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া যদি ঢাকার সঙ্গে আস্থার সংকট বাড়িয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতার অংশ হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
কারণ একটি বিষয় এখন পরিষ্কার—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আগের জায়গায় নেই। শেখ হাসিনার আমলের রাজনৈতিক সমীকরণ শেষ হয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হলে দিল্লিকে নতুন ভাষা, নতুন অগ্রাধিকার এবং নতুন রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নিয়ে এগোতে হবে।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন তাই—ভারত কি বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট দ্রুত বুঝতে পারছে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।





