পোবনিউজ২৪, ঢাকা ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার এক ঘণ্টার ব্যবধানে সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার দুপুর ১টা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিদের প্রবেশ পথে এই ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, কে বা কারা ককটেল ছুড়ে পালিয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছে- আসামি ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক (৫০ শতাংশ) বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং উক্ত সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ হইতে জুলাই বা অগাস্ট ২০২৪ সময়কালে নিহত ও আহত সকল ব্যক্তি বা তাদের পরিবারবর্গকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো।
জুলাইয়ের গণঅ্যভুত্থানের সময়ের ঘটনায় আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলন দমনের নির্দেশ, অপহরণ এবং হত্যার মতো তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
এই মামলার শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদেরের বেশ কয়েকটি অডিও শোনানো হয়েছে। এসব অডিওতে মি. কাদেরকে তার নেতা-কর্মীদের জুলাই অভ্যুত্থান দমনের নির্দেশ দিতে শোনা গেছে।
কাদেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো, ২০২৪ সালের ১১ই জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে তার সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথনে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
কাদের তখন বলেছিলেন, “মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?”
পরে ১৪ই জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা “রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি” উচ্চারণ করে যে বক্তব্য দেন সেই সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন।
তিনি অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
একইসঙ্গে, পরদিন “আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ” এমন বক্তব্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের দমন করতে কাদের নিজ দলের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। ১৫ই জুলাই শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।
এরই প্রেক্ষিতে বাহাউদ্দিন নাছিমের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে, কাদেরের ওই নির্দেশসহ অন্যান্য বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।
এমন হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং সারাদেশে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন।
আন্দোলন দমন করতে কাদের তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে,দু হাজার চব্বিশের ১৬ই জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন।
তার নির্দেশের পর আওয়ামি নেতাকর্মীরা গুলি করে চট্টগ্রামে চাঁন্দগাঁও থানাধীন মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে।
একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২০২৪ সালের ১৭ই জুলাই দলীয় নেতাদের তাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন দমনের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
পরদিন ধানমন্ডির আওয়ামি লিগের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে আখ্যা দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের ১৯শে জুলাই গণভবনে নিজ দল ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে বলেছিলেন, “এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শ্যুট অ্যাট সাইট হবে,” এর অর্থ দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।
সারা দেশে আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাহাউদ্দিন নাছিম অন্যতম ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।






