মীর আফরোজ জামান, পোবনিউজ২৪ ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : দুর্গাপূজা এলেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির রসনায় বিশেষ জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের ইলিশ। পদ্মা-মেঘনার রুপালি এই মাছের অপেক্ষায় থাকে কলকাতা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা পর্যন্ত মাছের বাজার। কিন্তু এবার সেই চেনা ছবিতে বড় পরিবর্তন। দুর্গাপূজার আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির কোনো সরকারি অনুমতি এখনো দেওয়া হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের পূজায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির পাতে বাংলাদেশের ইলিশ উঠবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, যে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পূজার আগে সীমিত পরিমাণ ইলিশ ভারতে যায়, চলতি বছর সেই বাংলাদেশেই ভারত থেকে ইলিশ এসেছে। জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশে ইলিশের সরবরাহ ঘাটতির কারণে এবার হাওড়া ও গুজরাট থেকেও বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানির তথ্যনানুযায়ী, সরকার যে পরিমাণ রপ্তানির অনুমতি দেয়, বাস্তবে তার পুরোটা ভারতে যায় না। ২০১৯ সালে ৫০০ টন অনুমতির পর রপ্তানি হয় ৪০০ টন; ২০২০ সালে ১ হাজার ৮৫০ টনের অনুমতির বিপরীতে যায় ৫৩২ টন। ২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টনের অনুমোদনের বিপরীতে রপ্তানি হয় ১ হাজার ২০০ টন এবং ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টনের বিপরীতে যায় ১ হাজার ৩০০ টন। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টনের অনুমতি দেওয়া হলেও রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৬৩১ টন বিভিন্ন সরকারি ও বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনে সংখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও অনুমোদনের তুলনায় বাস্তব রপ্তানি কম থাকার প্রবণতাটি স্পষ্ট।
২০২৪ সালেও একই চিত্র দেখা যায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রথমে ৩ হাজার টন ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২ হাজার ৪২০ টনের অনুমতি দেয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ২ হাজার ৪২০ টনের বিপরীতে ভারতে গেছে মাত্র ৫৭৭ টন। অর্থাৎ অনুমোদিত পরিমাণের প্রায় এক-চতুর্থাংশই বাস্তবে রপ্তানি হয়েছিল।
২০২৫ সালে অনুমতির পরিমাণ আরও কমিয়ে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন করা হয়। কিন্তু ৫ অক্টোবর রপ্তানির শেষ দিন পর্যন্ত ভারতে যেতে পেরেছে মাত্র ১০৭ টন ২২৬ কেজি ইলিশ। অর্থাৎ অনুমোদিত পরিমাণের ১০ শতাংশেরও কম।
চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত চিত্রটি আরও অনিশ্চিত। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূজা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মহাষষ্ঠী ১৭ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর। অথচ ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতির কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বরং কলকাতাভিত্তিক ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে। সংগঠনটি শুধু পূজার জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে ইলিশ আমদানির সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে।
ভারতীয় আমদানিকারকদের এই আবেদনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তই এখন মূল বিষয়। অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো পরিমাণ ইলিশ বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি করা সম্ভব নয়।
কেন এবার অনিশ্চয়তা বেশি? বাংলাদেশের ইলিশ ব্যাবসায়িরা বলছেন, প্রথমত, দেশে ইলিশের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি। চলতি মৌসুমে বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে ভারত থেকেই ইলিশ আমদানি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানি সাধারণ নিয়মিত রপ্তানি নয়; এটি শর্তসাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্য এবং সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে রপ্তানি করতে হয়। ২০২৫ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন রপ্তানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি প্রতি কেজি ইলিশের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ১২.৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন দুই দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলেছে। তবে ইলিশ রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ককে দায়ী করা যাবে না কারণ সরবরাহ, সরকারি অনুমোদন, মূল্য, সময়সীমা ও রপ্তানিকারকদের সক্ষমতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
কলকাতার বাজারে তাই প্রশ্ন একটাই বাংলাদেশের ইলিশের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাজারে যে আলাদা চাহিদা রয়েছে, সেটি এবারও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আবেদনে স্পষ্ট। কিন্তু চাহিদা থাকলেই সরবরাহ নিশ্চিত হয় না। বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি, রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতি, সীমান্তবন্দরে দ্রুত ছাড়পত্র এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চালান পৌঁছানো সবগুলো ধাপ সম্পন্ন হলেই পূজার বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ পৌঁছাবে।
আর সময়ও খুব বেশি নেই। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার মূল পর্ব শুরু হবে ১৭ অক্টোবর। ফলে এখন অনুমতি দেওয়া হলেও পূজার বাজার ধরতে রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে হবে।
চলতি বছরের আরেকটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হলো বাংলাদেশের বাজারেই ভারতীয় ইলিশের উপস্থিতি। বেনাপোল দিয়ে জুলাই ও আগস্টে মোট সাড়ে ৩ লাখ কেজির বেশি ইলিশ ঢোকার তথ্য পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বর মাসে মৎস্য অধিদপ্তর ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করেছে।
অর্থাৎ দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্যের প্রচলিত চিত্র এবার অনেকটাই বদলে গেছে। একদিকে কলকাতার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ইলিশ চাইছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় ইলিশ ঢুকেছে এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে সেই আমদানিও বন্ধ করা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে কি বদলাবে সিদ্ধান্ত? বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুত্র বলছে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাংলাদেশ সরকার কি শেষ পর্যন্ত পূজার আগে সীমিত পরিমাণ ইলিশ ভারতে পাঠানোর অনুমতি দেবে?
সরকারি অনুমতি না আসা পর্যন্ত এর উত্তর নিশ্চিত নয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অনুমতি পেলেও ঘোষিত পুরো পরিমাণ ভারতে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে না। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪২০ টনের অনুমতির বিপরীতে ৫৭৭ টন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ২০০ টনের বিপরীতে মাত্র ১০৭ টন ২২৬ কেজি রপ্তানি হয়েছিল।
ফলে এবারের বাস্তব চিত্র দাঁড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির চাহিদা আছে, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন; কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি এখনো নেই। আর অনুমতি এলেও অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অনুমোদিত পরিমাণের পুরোটাই যে কলকাতার বাজারে পৌঁছাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
সুতরাং, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির পাতে বাংলাদেশের ইলিশ উঠবে কি না এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। তবে সময় যত এগোচ্ছে, পূজার বাজারে নিয়মিত ও বড় পরিমাণে বাংলাদেশের ইলিশ পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় ততই সংকুচিত হচ্ছে।





