মীর আফরোজ জামান, ঢাকা ১২ জুলাই ২০২৬ : মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ দুর্যোগ। রাজধানী ঢাকায় কয়েক দিনের অব্যাহত বর্ষণে প্রধান সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যা ও পাহাড় ধসে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখের বেশি মানুষ। হাজার হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নগরজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মতিঝিল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে। অধিকাংশ সড়কে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। পানি ঢুকে বিকল হয়ে পড়ে অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকা পড়েন। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলা হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এসব জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হচ্ছে। বহু সড়ক, সেতু ও কালভার্ট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় এখনো নৌকাই মানুষের একমাত্র ভরসা।
চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে একাধিক স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর অনেকেই রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান। তবে সবাই সরে যেতে না পারায় পাহাড় চাপায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পাহাড় ধসে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছেন। টানা বৃষ্টি ও দুর্গম পথ উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড় ধস, পানিতে ডুবে যাওয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য বৃষ্টিজনিত দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষও রয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে।
বন্যার পানিতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রেখেছে।
কৃষি খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমনের বীজতলা, সবজি, পাট এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড,বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর কারণে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। নদীতীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর জলাবদ্ধতা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড় ধসের পুনরাবৃত্তি এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার ভরাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাহাড় কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে। তাঁদের মতে, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি টেকসই নগর পরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।






