পোবনিউজ২৪, ঢাকা জুলাই ১৫, ২০২৬ : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আলোচিত আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি পিপিএ এখন শুধু উচ্চমূল্যের কারণে নয়, সরবরাহের অনিশ্চয়তা, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা এবং চুক্তির ঝুঁকিপূর্ণ শর্ত নিয়েও নতুন করে প্রশ্নের মুখে। সরকারের পর্যালোচনা কমিটি ইতোমধ্যে চুক্তিটিকে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয়বহুল এবং প্রক্রিয়াগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে একাধিকবার সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দায়ে আবদ্ধ হয়েছে। সরকার-নিযুক্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানির বিদ্যুতের মূল্য তুলনীয় অন্যান্য আমদানিকৃত বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি এবং কয়লার মূল্য নির্ধারণসহ একাধিক ধারা বাংলাদেশের বিপক্ষে কাজ করছে।
কমিটির মতে, ভারতীয় করের বোঝাও ট্যারিফে যুক্ত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব কারণে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড -এর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
শুধু মূল্য নয়, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে গড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এতে জাতীয় গ্রিডকে বিকল্প উৎস থেকে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় বিদেশি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গ্রিড পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করে। যদি কোনো ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়, তখন দ্রুত ভারসাম্য রক্ষা করতে দেশীয় কেন্দ্রগুলোকে চালু করতে হয়, যা অতিরিক্ত ব্যয় ও অপারেশনাল চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড গত কয়েক বছরে সম্প্রসারিত হলেও, বড় আকারের সীমান্তপারের বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার জন্য আরও উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ ক্ষমতা এবং রিয়েল-টাইম ডিসপ্যাচ সক্ষমতা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতীতেও ট্রান্সমিশন অবকাঠামোর দুর্বলতা ও সমন্বয় ঘাটতি বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের কারণ হয়েছে।
সরকারি পর্যালোচনা কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে বাজারদর, মুদ্রার ওঠানামা কিংবা পরিচালনাগত ঝুঁকির বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর বর্তায়, অথচ বিনিয়োগকারীর লাভ অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্যের চুক্তিগুলোর কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড -এর লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন পর্যালোচনা প্রতিবেদনে আদানি চুক্তিকে এই আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও এটি একমাত্র কারণ নয়; ক্যাপাসিটি চার্জ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের চুক্তিও এতে ভূমিকা রাখছে।






