মীর আফরোজ জামান, পোবনিউজ২৪ ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২৬ : বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন সাময়িক কোনো ঝড়ে মুছে যাওয়ার নয় বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সাংবাদিক এম জে আকবর। একই সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলায় প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে শুধু ‘কী করা সম্ভব’ নয়, ‘কেন সম্ভব নয়’ এই প্রশ্ন সামনে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘ফাইভ সিজ, ওয়ান গ্যাদারিং স্টর্ম’ শীর্ষক বক্তব্যে এম জে আকবর এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কে উত্থান-পতন থাকতেই পারে। কিন্তু সাময়িক কোনো সংকট বা ঝড়কে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যকার যোগাযোগকে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এম জে আকবর বলেন, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে শুধু ‘এটি সম্ভব কি না’ -এই প্রশ্নের মধ্যে আটকে থাকলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয় না। বরং ‘কেন সম্ভব নয়’-এই প্রশ্নও করতে হবে। তাঁর মতে, চিন্তার এই পরিবর্তন জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার নতুন পথ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পরিচয়ের প্রসঙ্গ টেনে ভারতের সাবেক এই মন্ত্রী বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক সম্মানের ওপরও জোর দেন এম জে আকবর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে যথাযথ সম্মান না করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের চলমান সংঘাত ও যুদ্ধের ধরন নিয়েও বক্তব্য দেন এম জে আকবর। তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীর সংঘাতকে বিংশ শতাব্দীর প্রচলিত কাঠামো দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত শুরু হচ্ছে, থামছে এবং আবার নতুন করে দেখা দিচ্ছে-বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটি।
বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দুই বিশ্বযুদ্ধের পাশাপাশি স্নায়ুযুদ্ধকেও বিস্তৃত অর্থে বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধ তুলনামূলকভাবে ‘ঠান্ডা’ থাকলেও এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব ছিল সরাসরি ও রক্তক্ষয়ী।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাতের পেছনের কারণ এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি। কোনো সংঘাতকে শুধু তার দৃশ্যমান ফলাফল দিয়ে বিচার না করে তার উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন এম জে আকবর।
তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য “‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচার্স: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন”।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, জলবায়ু, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এম জে আকবরের বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।






