পোবনিউজ২৪, ঢাকা ১৭ মে ২০২৬ : বাংলাদেশে হামে শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকায় আগের অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। তাদের অভিযোগ, সময়মতো স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করা, টিকার ঘাটতি, দুর্বল নজরদারি এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে গাফিলতির কারণেই শত শত শিশুর প্রাণ ঝরছে।
রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে শনিবার বিকেলে ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ আয়োজিত ‘হামে শিশুমৃত্যু: জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব কথা বলেন। তাদের ভাষ্য, চার শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সরকার দায় এড়াতে পারে না।
এদিকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৩। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৭৪ জন, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৭৯ জন।
সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. এমএইচ ফারুকী বলেন, হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা স্পষ্ট। গাফিলতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি (ভারপ্রাপ্ত) স্ট্যানলি গুয়াভুইয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, টিকা কেনায় জটিলতা, রোগ নজরদারি প্রতিবেদনে দেরি, জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন না হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে।
ডা. ফারুকী আরও বলেন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগামী বাজেট থেকেই স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মৃত্যুহার কমাতে হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য আইসিইউ সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ এবং আক্রান্তদের দ্রুত প্রতিরোধ জরুরি।
আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যখন কোনো সংক্রামক রোগকে জনস্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তবে বাংলাদেশে সেই ঘোষণা না আসায় আক্রান্ত শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ, সরকারি খরচে চিকিৎসা, সব সরকারি হাসপাতালে ‘হাম কর্নার’ চালু এবং পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিতসহ ১৫ দফা দাবি জানানো হয়।
ময়মনসিংহে ৭৭ শতাংশেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি
হামে আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে যত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এর প্রায় ৭৭ শতাংশেরই বয়স ছিল ৯ মাসের নিচে। অর্থাৎ তারা সরকারি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসার আগেই সংক্রমণের শিকার হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মৃত ৩১ শিশুর মধ্যে ২৪ জনের বয়স ছিল শূন্য থেকে ৯ মাসের মধ্যে। এদের মধ্যে ১৮ জন ছেলে ও ৬ জন মেয়ে। এ ছাড়া ১০ থেকে ১৫ মাস বয়সী চার শিশু এবং ১৫ মাসের বেশি বয়সী আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একজনের বয়সের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, এই সময়ে আইসিইউ খুব জরুরি ছিল। সেটি থাকলে হয়তো এত শিশুর মৃত্যু হতো না।
এদিকে, শনিবার রাজধানীর পল্টন মোড়ে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের উদ্যোগে ৪ শতাধিক হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী ড. ইউনুস, নুরজাহান বেগমসহ সকলকে গ্রেপ্তার করে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সভাপতি যুবনেতা খান আসাদুজ্জামান মাসুমের সভাপতিত্বে, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক যুবনেতা শাহিন ভূইয়ার সঞ্চালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক যুবনেতা জাহাঙ্গীর আলম নান্নু, প্রেসিডিয়াম সদস্য যুবনেতা চৌধুরী জোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি যুবনেতা ইরান মোল্লা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক যুবনেতা রফিজুল ইসলাম রফিক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক যুবনেতা শাখারভ হোসেন সেবক প্রমুখ।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন-আমরা ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়ে জেনেছিলাম “কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে পূর্বে কলেরা, ডায়রিয়া, হাম, বসন্ত রোগেও গ্রাম উজার হয়ে যেত।” এসব পাঠ্য পুস্তকে পড়া কথা। বাস্তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষে এই সকল রোগ এখন আর মহামারী নয়। কিন্তু ইন্টেরিম সরকারের সময়ে পরিকল্পিতভাবে শিশুহত্যার নীল নকশা করা হয়। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমকে বাতিল করে ইন্টেরিম সরকার। যার ফলশ্রুতিতে হাম এখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে! পরিকল্পিতভাবে শিশুহত্যার পরিকল্পনাকারী সাবেক ইন্টেরিম প্রধান ড. ইউনুস, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ জড়িত সকলকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন-জনগণের শঙ্কট সমাধানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মহান সংসদে জনগণের সাথে তামাশা করছেন। বর্তমান সময়ে হাম যখন জাতীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে দৃশ্যমান তখন তা নিয়ে সংসদ নিশ্চুপ! সরকারি বিরোধীদল নিশ্চুপ দেশ বিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে। অবিলম্বে জনগণের আকাঙ্ক্ষার জাতীয় সংসদে রূপান্তরসহ আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ব্যায় সরকারের বহন করার দাবি জানানো হয়।






