পোবনিউজ২৪, ঢাকা ১৬ জুন ২০২৬ : রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত শতবর্ষী বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন সোমবার সফর করেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সক্রিয়তা এবং আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ বিবেচনায় নিলে সফরটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস একটি প্রেসনোটে জানিয়েছে, রাষ্ট্রদূত সারদায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ঐতিহ্য উদযাপন করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এখন? কেন পুলিশ একাডেমি? এবং কেন এমন একটি সময়ে, যখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা, নির্বাচন, অভিবাসন ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি? পুলিশ একাডেমিই বা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সারদার বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি কেবল একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নয়। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান দেশের পুলিশ নেতৃত্ব তৈরির প্রধান কেন্দ্র। বাংলাদেশ পুলিশের অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এখান থেকেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ফলে এখানে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি প্রতীকী অর্থ বহন করলেও তার কৌশলগত গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কি শুধুই প্রশিক্ষণ?
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন প্রকাশ্যে বলেছেন, ২০১০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম সহায়তা দিয়েছে। একই বৈঠকে তিনি (এসপিইএআর) এবং (ইএনভি) কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
(এসপিইএআর)কর্মসূচি মূলত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে (ইএনভি) ইলেকট্রনিস্ক ন্যাশনালিটি ভেরিভিকেশান অভিবাসন ও পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রশিক্ষণ নয়, নিরাপত্তা তথ্য, পরিচয় যাচাই এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও গভীরতর সম্পৃক্ততা চাইছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে একটি প্রশ্ন ঘুরছে—অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব সমঝোতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সারদা সফর কি তার ধারাবাহিকতা?
এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য দলিল নেই যা সরাসরি এই সফরকে নতুন কোনো চুক্তির বাস্তবায়ন হিসেবে প্রমাণ করে। তবে বাস্তবতা হলো, গত এক বছরে নিরাপত্তা, অভিবাসন, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেকে মনে করছেন এটি কি ইউনুস সরকারের সময়কার সমঝোতার ধারাবাহিকতা?
ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, সারদা সফরকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
যদি এটি ভারতীয় রাষ্ট্রদূত করতেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের যুক্তি, একই সফর যদি ভারতীয় রাষ্ট্রদূত করতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হতো।
এর কারণ দুটি।
প্রথমত, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ান দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ফলে ভারতের যেকোনো নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সম্পৃক্ততা সহজেই রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; কিন্তু ভারতকে প্রায়শই সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আলোচনায় টেনে আনা হয়।
অতএব প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য কেবল ঘটনার কারণে নয়; বরং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে ঘিরে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারণার ফল।
র্ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট শুনানিতে বাংলাদেশে চীনা প্রভাব, সামরিক সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথাও বলেছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে সারদা সফরকে অনেকেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সমান আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মূল রহস্য কোথায়?
প্রকৃত রহস্য সম্ভবত সফরের দৃশ্যমান অংশে নয়, অদৃশ্য অংশে।
রাষ্ট্রদূত সারদায় গেছেন—এটি খবর। কিন্তু কেন এই সময়ে গেছেন, কারা তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, নিরাপত্তা সহযোগিতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী, এসপিইএআর ও ইএনভি বাস্তবায়ন কতদূর এগিয়েছে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দৃষ্টিতে এটিকে সাধারণ কূটনৈতিক কার্যক্রম বলে মনে হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদশর্ন এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা, কৌশলগত উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি দৃশ্যমান বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।






