মীর আফরোজ জামান, পোবনিউজ২৪, ঢাকা, জুলাই ২৮, ২০২৬ : বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে সয়াবিন তেল। কিন্তু সেই তেল কতটা নিরাপদ? বোতলের গায়ে লেখা “বিশুদ্ধ”, “ফর্টিফায়েড” কিংবা বিএসটিআই “অনুমোদিত”—এসব দাবির আড়ালে কতটা মানসম্মত তেল পৌঁছাচ্ছে ভোক্তার ঘরে? দেশের বিভিন্ন গবেষণা, সরকারি পরীক্ষাগার, আদালতের অভিযান এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বাজারে নিম্নমানের, নকল ব্র্যান্ডের এবং মানদণ্ড পূরণ না করা সয়াবিন তেল নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের সব ব্র্যান্ডের তেল ভেজাল—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই। বরং সমস্যা মূলত কিছু নমুনা, কিছু ব্র্যান্ডের ব্যাচ, খোলা তেল এবং নকল উৎপাদনচক্রকে ঘিরে।
উৎপাদনের শুরু থেকেই কোথায় ঝুঁকি? বাংলাদেশে অধিকাংশ কোম্পানি বিদেশ থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করে রিফাইনারিতে পরিশোধন করে বাজারজাত করে।
একটি আদর্শ রিফাইনিং প্রক্রিয়ায় থাকে—ডিগামিং, নিউট্রালাইজেশন, ব্লিচিং,ডিওডোরাইজেশন,ফিল্টারিং,ভিটামিন-এ সংযোজন ও বোতলজাতকরণ। এই ধাপগুলোর যেকোনো একটিতে অনিয়ম হলে তেলের গুণগত মান কমে যেতে পারে।
কী ধরনের ভেজাল মেশানো হতে পারে?খাদ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, অসাধু চক্র লাভ বাড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে পারে—নিম্নমানের অপরিশোধিত তেল, তুলাবীজের তেল বা অন্য সস্তা ভোজ্যতেল মিশ্রণ, অতিরিক্ত অক্সিডাইজড তেল, বহুদিন সংরক্ষিত তেল, ব্যবহৃত তেল পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা নকল বোতল ও লেবেল ব্যবহার ও মানসম্মত ভিটামিন-এ না মেশানো। এসব ক্ষেত্রে তেলের রং, গন্ধ বা স্বাদ সবসময় পরিবর্তিত নাও হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রকাশিত এক গবেষণায় বাজার থেকে সংগৃহীত আটটি ব্র্যান্ডের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়—৮টির মধ্যে ৫টি নমুনা বিএসটিআই -এর এক বা একাধিক মান পূরণ করতে পারেনি। অধিকাংশ নমুনায় কপার ও কিছু নমুনায় আয়রনের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। অ্যাসিড ভ্যালু, পারঅক্সাইড ভ্যালু ও আর্দ্রতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বিচ্যুতি পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এসব বিচ্যুতি নিম্নমানের কাঁচমাল, অপর্যাপ্ত রিফাইনিং অথবা ভেজালের ইঙ্গিত হতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে সংগ্রহ করা ভোজ্যতেলের নমুনা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বিএসটিআই -এর পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করায়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে তিনটি ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলে মানদণ্ড অনুযায়ী কিছু রাসায়নিক সূচকে অসঙ্গতি পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তিনটি কোম্পানি হল, পুষ্টি, তীর ও রূপচাঁদা। অভিযোগে বলা হয়েছে, পুষ্টি ( শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাজট্রিজ) তাদের নমুনায় পেরোক্সাইড ভেলু অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। পেরোক্সাইড ভেলু বেশি হলে বোঝায় তেলের অক্সিডেশন শুরু হয়েছে, যা তেলের সতেজতা ও গুণগত মান কমে যাওয়ার ইঙ্গিত।
তীর, (সিটি এডিবল অয়েল লি:) পেরোক্সাইড ভেলু নির্ধারিত মান অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এছাড়াও পরীক্ষায় মান নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অসঙ্গতি উল্লেখ করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস নমুনায়ও পেরোক্সাইড ভেলু নির্ধারিত সীমার বেশি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রূপচাঁদা ( বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লি:) নমুনায়ও পেরোক্সাইড ভেলু নির্ধারিত সীমার বেশি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই নিরাপদ খাদ্য আইনে তিনটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
উল্লেখ্য,পেরোক্সাইড ভেলু বেশি পাওয়া মানেই তেল ভেজাল—এমনটি নয়। এটি মূলত তেলের অক্সিডেশন বা নষ্ট হওয়ার প্রাথমিক মাত্রা নির্দেশ করে। এই মান নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে তেল নিরাপদ খাদ্যমান পূরণ করছে না বলে বিবেচিত হতে পারে এবং সে কারণেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের উল্লেখযোগ্য অংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সীমার (২%) চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে। ট্রান্স ফ্যাট হৃদরোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ হিসেবে পরিচিত। গবেষণাটি সব ব্র্যান্ডকে নয়, পরীক্ষিত নমুনাগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করে।
ভিটামিন-এও মানসম্মত নয়? সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভোজ্যতেলে নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিটামিন-এ থাকতে হবে। ২০২৪ সালের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষিত বহু ব্র্যান্ডে ভিটামিন-এ-এর মাত্রা বিএসটিআই নির্ধারিত সীমার নিচে ছিল। শরীরে কী ক্ষতি হতে পারে?
চিকিৎসকদের মতে দীর্ঘদিন নিম্নমানের বা অক্সিডাইজড তেল খাওয়ার ফলে—হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে, কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, লিভারের ওপর চাপ পড়ে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে একাধিকবার জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামে খোলা তেল বোতলজাত করার কারখানা ধরা পড়েছে। এসব কারখানায়—ব্যবহৃত বোতল, নকল ক্যাপ, জাল লেবেল,নিম্নমানের তেল ব্যবহার করে বাজারে সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাজারে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি হওয়া পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—রূপচাঁদা, তীর, ফ্রেশ, বসুন্ধরা, পুষ্টি, মক্কা, কিং, শেফস চয়েস, জানতা, এভরিডে ও শাদ ।
বিএসটিআই কী পরীক্ষা করে? মানদণ্ড অনুযায়ী সয়াবিন তেলে পরীক্ষা করা হয়—অ্যাসিড ভ্যালু, পারঅক্সাইড ভ্যালু, আর্দ্রতা, স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু, আয়োডিন ভ্যালু, আপেক্ষিক ঘনত্ব, কপার, আয়রন, ভিটামিন-এ, অমেধ্য মানদণ্ড অনুযায়ী তেল হতে হবে স্বচ্ছ, দুর্গন্ধমুক্ত এবং ভেজালমুক্ত। কেন ভেজাল বন্ধ হচ্ছে না? খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে—
মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা হয় না। নকল কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান নিয়মিত নয়। খোলা তেলের বাজার এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তি অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।






