পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ১০ জুলাই ২০২৬ : বাংলাদেশে কারা হেফাজতে মৃত্যু অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে এ রকম কিছু মৃত্যু নানা আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার ভুক্তভোগীরা উল্লেখযোগ্য অংশের রাজনৈতিক পরিচয়; তাঁরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তৃণমূলের অসংখ্য নেতা-কর্মী বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকেই কারাগার ও রাষ্ট্রের হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে বাংলাদেশে।
আওয়ামী লীগের দাবি, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে অগনিত নেতা-কর্মী কারাগার বা হেফাজতে মারা গেছেন। তবে এই সংখ্যার কোনো সরকারিভাবে প্রকাশিত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সমন্বিত তালিকা নেই।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ২৪ জুন এক হাজতির মৃত্যু হয়। তাঁর নাম নুরুল আলম। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাতকানিয়া উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সেদিন সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নুরুল আলম ২৩ জুন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানায় হওয়া বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নুরুল আলমের ভাই নূর মোহাম্মদ মিডিয়াকে বলেন, এলাকায় জমি নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন স্থানীয় নেতার সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রয়েছে। সাতকানিয়া ভূমি অফিসে ওই জমি নিয়ে শুনানি ছিল। শুনানিতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তাঁর ভাই। সেখান থেকে তাঁকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করেছে। নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নামে কোনো মামলা ছিল না। জায়গা-জমির বিরোধে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
প্রশ্ন ওঠে, ২০২৪ সালে মামলা হয়ে থাকলে প্রায় দুই বছর পর ২০২৬ সালে তাঁকে কেন গ্রেপ্তার দেখাতে হলো? তাঁর ‘পরিবারের অভিযোগ—ডিবিকে দিয়ে একটি ভূমিদস্যু চক্র তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করিয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, কারা হেফাজতে বা কারাগারে বন্দীর মৃত্যু। বাংলাদেশে কারাগারগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা থেকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, এ বছরে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫২ জন। অর্থাৎ প্রতি মাসে ১০ জনের বেশি বন্দী মারা গেছেন।
গত ২১ জানুয়ারি বেলা সোয়া তিনটার দিকে বরিশাল নগরের পশ্চিম কাউনিয়ায় খান বাড়িতে পুলিশের অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে রাশেদ খান মেনন (৪২) নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এক আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়। তাঁর বড় ছেলে ইমতিয়াজ খান মিডিয়াকে বলেন, কাউনিয়া থানার ৯ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য তাঁর বাবাকে গ্রেপ্তার করতে তাঁদের বাড়িতে আসেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁর বাবা বাসার পেছনের দেয়াল টপকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দেয়াল টপকে অপর প্রান্তে একটি ড্রেনের স্ল্যাবের ওপর পড়ার পর সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে যান। পরে স্বজনেরা গিয়ে দেখেন তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে।
ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমার বাবা হৃদ্রোগী ছিলেন। কয়েক মাস আগে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে রিং বসানো হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তিনি বাড়িতেই ছিলেন। আমার জানামতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাশেদ খানের এক নিকটাত্মীয় বলেন, বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে গেলে পুলিশি হয়রানি আরও বাড়বে, এ আশঙ্কায় স্বজনেরা লাশের ময়নাতদন্ত করতে দেননি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টি বাংলাদেশে খুবই ধারাবাহিক একটি ঘটনা। সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের একটি প্রতিবেদনে ২০০১ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুনের মধ্যে ৪৮৬টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। লক্ষণীয় হলো ২০০১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব সরকারের আমলেই এসব মৃত্যু হয়েছে।
ওই প্রতিবেদন অনুসারে ১০ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১৮৪টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এরপর ২৯ অক্টোবর ২০০৬ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০০৭ পর্যন্ত একটি স্বল্পকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, যে সময়ে ৬টি মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। এরপর ১১ জানুয়ারি ২০০৭ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪২টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে; এ সময়ে ২১৩টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থাৎ ৯ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের মধ্যে ২৯টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দুটি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ২৯০ জন, ২০২৪ সালে ২৬১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৭০ জন বন্দী মারা যান। সর্বশেষ ৯ জুলাই ২০২৬ কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ঢাকার মোহাম্মদপুরের যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক মনিরুজ্জামান মনির ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো যেমন আশঙ্কাজনক, তেমনি কারাগারে মৃত্যুর বিভিন্ন খবর ও তথ্য–উপাত্ত বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ রকম কিছু খবরের উদাহরণ হলো: ‘বগুড়ায় কারা হেফাজতে ১ মাসে ৪ আ.লীগ নেতার মৃত্যু, ‘১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১২ মাসে কারাগারে ১৮ জন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৮ দিনে কারা হেফাজতে মোট ৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন।’ (কারা হেফাজতে ‘রাজনৈতিক মৃত্যুর’ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে মানবিক প্রশ্ন, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কারা হেফাজতে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং বাকি ২৭ জন সাধারণ কারাবন্দী।
এসব খবর–তথ্য–উপাত্ত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, গত প্রায় দুই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় যাঁরা ভুক্তভোগী, তাঁদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী।






