পোবনিউজ২৪, ঢাকা ৩ অক্টোবর ২০২৬ : আত্মনির্ভরশীলতা, স্থায়িত্ব ও অভিন্ন ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে খাদিকে উদ্যাপন করা হলো ‘খাদি কথা’ আয়োজনে। মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার (২ অক্টোবর) ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে (আইজিসিসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে খাদির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, দেশীয় বয়নশিল্পের শেকড় এবং আধুনিক ফ্যাশনে এর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
সত্য, অহিংসা ও মানবসেবার আদর্শ স্মরণের পাশাপাশি আয়োজনে শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণে পোস্টার ও কুইজ প্রতিযোগিতা, সর্বধর্ম প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং খাদি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গান্ধীর সত্য, অহিংসা ও স্বার্থহীন সেবার চিরন্তন বার্তা স্মরণ করেন এবং সমকালীন সমাজেও এসব আদর্শের প্রাসঙ্গিকতার কথা তুলে ধরেন।
‘খাদি কথা’র অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশি ডিজাইনার শ্রী বিপ্লব সাহার বিশেষ উপস্থাপনা। ঐতিহ্যবাহী খাদির বুনন ও বৈশিষ্ট্যকে আধুনিক পোশাকের নকশা ও নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি দেখান, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদিকে কীভাবে সমকালীন ফ্যাশনের অংশ করে তোলা সম্ভব।
আয়োজনস্থলে ফ্রেন্ডশিপ (নদী লিমিটেড) এবং কুমিল্লা খাদি ঘর-এর খাদি বস্ত্রের স্টল দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন ধরনের খাদি কাপড় ও পোশাকের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চরকা কাটার সরাসরি প্রদর্শনী আয়োজনটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। চরকার ঘূর্ণন, হাতে সুতা তৈরির প্রক্রিয়া এবং তাঁতের বস্ত্র তৈরির ঐতিহ্য দর্শনার্থীদের সামনে খাদির শেকড়কে জীবন্ত করে তোলে।
খাদি শুধু একটি বস্ত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কারুশিল্প, আত্মনির্ভরতার চেতনা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা। হাতে সুতা কাটা ও তাঁতে কাপড় বোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বহুদিন ধরে চলে আসছে। স্থানীয় তুলা, কারিগরের দক্ষতা এবং তাঁতের ছন্দে তৈরি এই কাপড় একদিকে যেমন ব্যবহারিক, অন্যদিকে তেমনি বহন করে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়।
ঔপনিবেশিক সময়ে বিদেশি কাপড়ের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দেশীয় সুতা ও বস্ত্রকে উৎসাহিত করার আন্দোলনে খাদি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে চরকা ও খাদি স্বদেশি ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে খাদির সঙ্গে কেবল পোশাকের সম্পর্ক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার একটি ঐতিহাসিক চেতনারও সম্পর্ক তৈরি হয়।
বাংলাদেশে কুমিল্লার খাদি এ ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারক। কুমিল্লা অঞ্চলের তাঁতি ও কারুশিল্পীদের হাত ধরে খাদি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অংশ হয়ে আছে। হাতে তৈরি খাদির নিজস্ব বুনন, আরাম ও বৈশিষ্ট্য একে দেশীয় বস্ত্রের জগতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
একসময় খাদি মূলত ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে এর ব্যবহার বহুমাত্রিক। শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কুর্তা, কামিজ, জ্যাকেটসহ নানা পোশাকে খাদির ব্যবহার বাড়ছে। দেশীয় ডিজাইনাররা খাদির নিজস্ব টেক্সচার ও বুননকে আধুনিক কাটিং, রং ও নকশার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করছেন।
বিপ্লব সাহার বিশেষ উপস্থাপনাতেও সেই পরিবর্তনের চিত্র ফুটে ওঠে। এতে বোঝা যায়, ঐতিহ্যকে ধরে রেখেও নতুন নকশা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে খাদিকে সমকালীন ফ্যাশনের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদির গুরুত্বও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় কারিগর, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে খাদি শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘খাদি কথা’ তাই শুধু একটি প্রদর্শনী বা সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রয়াস। চরকার সুতা থেকে আধুনিক ফ্যাশন এই দীর্ঘ যাত্রায় খাদি আজও আত্মনির্ভরতা, কারুশিল্প ও দেশীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকীর আয়োজনকে কেন্দ্র করে খাদির এই উপস্থাপনা যেন সেই পুরোনো বার্তাকেই নতুনভাবে সামনে আনে নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলা।





