মীর আফরোজ জামান , পোবনিউজ২৪ ঢাকা ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বিশেষ প্রতিবেদন
একসময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত পরিসরগুলোর একটি ছিল ক্যান্টনমেন্ট—যেখানে সামরিক শৃঙ্খলা, কমান্ড কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই পরিসরেই এখন তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। সাবেক সেনাপ্রধান থেকে শুরু করে গোয়েন্দা ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ পদে থাকা একাধিক সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে ঘিরে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান এগোচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কারও সম্পদ জব্দ বা ক্রোকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কেউ রয়েছেন কারাগারে—আর নতুন করে তলব করা হচ্ছে সাবেক সেনাপ্রধানদেরও। ফলে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনি পরিণতিই নয়, বাহিনীর ভেতরে জবাবদিহি, পদোন্নতি, কমান্ড-আস্থা ও পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিকতায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) এস এম শফিউদ্দিন আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১৪ সেপ্টেম্বর হাজির হওয়ার কথা থাকলেও তিনি ৩০ দিন সময় চেয়ে আবেদন করেন। দুদক জানিয়েছে, পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয় ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫। দুদকের নথি অনুযায়ী, অনুসন্ধানটি এখনো অভিযোগ যাচাইয়ের পর্যায়ে; অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর মধ্যেই সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণী যাচাই শুরু করেছে দুদক। ৬ সেপ্টেম্বর এ জন্য অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগের তথ্য প্রকাশ করা হয়। তার স্ত্রী দিলশাদ নাহার কাকলীর সম্পদ বিবরণীও যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে। আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগে এর আগেই দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
শুধু দুই সেনাপ্রধানই নয়
দুদকের নজরদারির পরিধি সাবেক দুই সেনাপ্রধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাবেক গোয়েন্দা, টেলিযোগাযোগ নজরদারি, বিশেষ নিরাপত্তা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তাকে ঘিরেও অনুসন্ধান ও মামলা চলছে।
সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে দুদকের মামলা রয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ২২.২৭ কোটি টাকার বেশি সম্পদ অর্জন এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এ মামলায় কারাগারে রয়েছেন এবং তার সম্পত্তি নিয়েও দুদকের কার্যক্রম হয়েছে। এগুলো অবশ্যই অভিযোগ ও মামলার নথিতে উত্থাপিত বিষয়; বিচারিকভাবে অপরাধ প্রমাণের বিষয়টি আলাদা।
সেপ্টেম্বরেই সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ, তার স্ত্রী নিগার সুলতানা ও শ্যালক শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মামুন খালেদের নামে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫ টাকা, তার স্ত্রীর নামে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৯ টাকা এবং শ্যালকের নামে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে এসএসএফের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মজিবুর রহমান ও তার স্ত্রী তাসরীন মুজিবের বিরুদ্ধে পৃথক মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মজিবুর রহমানের নামে ২ কোটি ৭১ লাখ ৬ হাজার ২৫২ টাকা এবং তার স্ত্রীর নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৯ হাজার ১৯৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্যান্টনমেন্টে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে
সাবেক ও বর্তমান সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় একের পর এক পদক্ষেপের ফলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন হচ্ছে—ব্যক্তির বিরুদ্ধে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, একই সঙ্গে বাহিনীর পেশাগত ধারাবাহিকতা কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা হবে?
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে সামরিক হেফাজতে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল সেনাবাহিনী। পরে তাদের মধ্যে ১৫ জনকে ক্যান্টনমেন্টের একটি অস্থায়ী কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। একই সময়ে সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, বিচারপ্রক্রিয়াকে তারা সমর্থন করে এবং আইনের বাইরে কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরির অবস্থান, পদমর্যাদা, কমান্ড কাঠামো ও প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অভিযোগ বা চার্জশিটের কারণে চাকরির অবস্থা কী হবে—তা সংশ্লিষ্ট আইন ও আইনি ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।
এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে দুদকের দুর্নীতি অনুসন্ধান। ফলে ক্যান্টনমেন্টে সম্ভাব্য কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি হতে পারে—পদোন্নতি ও পোস্টিংয়ে অতীতের রেকর্ড কীভাবে মূল্যায়ন হবে, অভিযুক্ত বা অনুসন্ধানাধীন কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব কী থাকবে, তদন্তাধীন ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের সীমা কোথায় থাকবে এবং কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার অধীনস্থ ইউনিটে কমান্ড আস্থার ওপর কী প্রভাব পড়বে।
এসবের কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং এগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক প্রশাসনের সামনে থাকা নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত প্রশ্ন।
পদোন্নতিতেও এখন ‘মেরিট’ ও ‘ইন্টিগ্রিটি’
২০২৬ সালে সামরিক বাহিনীর পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়েও সরকার প্রকাশ্যে পেশাদারিত্ব, মেধা, সততা ও নেতৃত্বের ওপর জোর দিয়েছে। জুলাইয়ে আর্মি হেডকোয়ার্টার্স সিলেকশন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা, সততা, নৈতিক চরিত্র ও নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
এই বক্তব্যের সঙ্গে চলমান তদন্তের একটি সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র রয়েছে: বাহিনীকে একই সঙ্গে দুইটি কাজ করতে হচ্ছে—অতীতের অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা।
কারণ একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত থাকা এবং তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হওয়া এক বিষয় নয়। আবার অভিযোগের কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আটকে গেলে সেটিও বাহিনীর স্বাভাবিক কমান্ড ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে তদন্তাধীন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অভিন্ন, লিখিত ও আইনসম্মত নীতিমালা সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাহিনীর ভাবমূর্তি বনাম ব্যক্তির দায়
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক, পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর কিছু অংশ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছিল—যদিও এসব বিশ্লেষণের ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন এক নয়।
এখানে মূল পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুরো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় আলাদা করাই সামরিক পেশাদারিত্ব রক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
এ কারণে চলমান তদন্তের ফল শুধু সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি ভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীর সম্পদ ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহি, পোস্টিং-পদোন্নতি এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাহিনীর সম্পর্কের কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন
এক. অভিযোগের তদন্ত কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রমাণভিত্তিকভাবে শেষ করা যাবে?
দুই. তদন্তাধীন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাহিনীর ভেতরে পদ, দায়িত্ব, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে একটি অভিন্ন নীতি তৈরি হবে কি না?
তিন. ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা হবে?
দুদকের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখাচ্ছে, সাবেক সামরিক নেতৃত্বও এখন আর তদন্তের বাইরে নয়। শফিউদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান এখনো তদন্ত পর্যায়ে; আজিজ আহমেদের সম্পদ বিবরণী যাচাই চলছে; আর কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ইতিমধ্যে হয়েছে।
অতএব, সামনে বিষয়টি শুধু ‘কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলো’—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বড় প্রশ্ন হবে, বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং পেশাদার সামরিক কাঠামোর মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করে।






