পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পবিত্র মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাব এবার বাংলাদেশের জনপরিসরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব হুতি হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা সহযোগিতা নিতে পারে এমন আন্তর্জাতিক সংবাদ ও প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদিনায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি হজ ও ওমরাহ পালন করতে যাওয়ায় বিষয়টি ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তবে রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের কাছে মক্কা রক্ষার জন্য সামরিক সহযোগিতা চেয়েছে এমন কোনো প্রকাশ্য সৌদি সরকারি ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বরং সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলা মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েল, সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যে বুধবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতি বাহিনীর একটি ড্রোন মক্কার দক্ষিণে শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি সামরিক মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি মক্কার নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছে এবং মক্কার নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ২০১৭ সালের পর মক্কার দিকে হুতি হামলার দ্বিতীয় অভিযোগিত ঘটনা।
এর একদিন আগেও সৌদি আরব মক্কা ও জেদ্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছিল। হুতিদের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনা সৌদি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় নয়। হজ ও ওমরাহ পালনে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সৌদি আরব সফর করেন। ২০২৬ সালের হজ মৌসুমেও মক্কা ও মদিনায় বাংলাদেশ হজ মিশনের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রম চালু ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই মৌসুমে বাংলাদেশি হাজিদের জন্য সৌদি আরবে ব্যাপক পরিসরে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়।
ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতি হলে বাংলাদেশি হাজি ও ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল, যাতায়াত এবং ভবিষ্যৎ হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েল প্রসঙ্গ। ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব দীর্ঘদিনের। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা বা সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারের সম্ভাবনার খবর অনেকের কাছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশকে বাংলাদেশের সামগ্রিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী জনমত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো ঢাকা সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানায়।
৮ সেপ্টেম্বর হুতি হামলায় সৌদি ভূখণ্ডে বেসামরিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার নিন্দা করে এবং সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি ‘অবিচল সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করে।
তবে ইসরায়েলি সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো পৃথক ও নির্দিষ্ট সরকারি বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সৌদি আরবের নিরাপত্তা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করার পর বাংলাদেশও সম্ভাব্যভাবে এতে যুক্ত হবে কি না এ নিয়ে ঢাকায় আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, আমন্ত্রণ পেলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
সৌদি আরবের জন্য বর্তমান সংকটটি শুধু হুতি হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদাব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, তেল পরিবহন এবং ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা সবকিছু মিলিয়ে রিয়াদের নিরাপত্তা হিসাব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব যদি ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ব্যবহার করে, সেটি একদিকে হুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে যে কোনো প্রকাশ্য নিরাপত্তা সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন তাই শুধু ‘সৌদি আরব ইসরায়েলের সহযোগিতা নিচ্ছে কি না’ নয়; বরং এই সহযোগিতার ফলে মক্কা-মদিনার নিরাপত্তা, বাংলাদেশি হাজি-ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়ে সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মক্কা সরাসরি ইসরায়েলি সহযোগিতার কারণে হুমকিতে পড়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বাস্তব ও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হলো হুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা।






