পোবনিউজ২৪, যুক্তরাজ্য মে ১৪, ২০২৬ : আমেরিকান অর্থনীতি এবং চীনা অর্থনীতি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে, আমেরিকান বন্ড মার্কেট চীনা ঋণদাতাদের উপর নির্ভরশীল এবং আমেরিকান নির্মাতারা চীনা যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের উপর নির্ভরশীল। বিশেষত, সামরিক ও উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামগুলো চীনা নির্মাতা এবং দুর্লভ খনিজ শোধনাগারগুলো থেকে আসে। এ কারণেই চীনের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা আমেরিকায় ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ঘটাচ্ছে এবং আমেরিকান নির্মাতাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে… যেমন তাদের সামরিক সরঞ্জাম এবং উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির আকাশে একটি অস্থিতিশীল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জনের মধ্যেই সম্প্রতি ঢাকার অভিজাত হোটেল র্যাডিসন ব্লু-তে একটি অতি-গোপনীয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI) ও এনএসআই (NSI)-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’ সম্পর্কিত অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অন্তর্ভুক্ত। ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙতে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদকে শক্তিশালী করতে এই অঞ্চলে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক অক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তুরস্ক-পাকিস্তান লবি এবং তারেক রহমানের নতুন কৌশল
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এখন সরাসরি পাকিস্তান ও তুরস্ক লবির দিকে ঝুঁকছেন। এই লবিটি তারেক রহমানের জন্য একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে, কারণ তুরস্কের বর্তমানে উভয় পরাশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রয়েছে। এই তুরস্ক-পাকিস্তান অক্ষটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘কৌশলগত যুদ্ধবিরতি’-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
মার্কিন ‘ইউ-টার্ন’ এবং মিয়ানমার সমীকরণ
মিয়ানমারের দুর্লভ খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের মার্কিন কৌশল ব্যর্থ হলে, ওয়াশিংটন নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আনে। এখন তারা এই অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তুরস্ক-চীন-পাকিস্তান পথ ব্যবহার করতে চায়। ভারত একসময় ‘কোয়াড’-এ অতি-সক্রিয় হয়ে চীন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল, যা দিল্লির জন্য একটি কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ, নিজেদের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পিঠে এক ধরনের ‘কূটনৈতিক ছুরি’ মেরে চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সঙ্গে আপোস করেছে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তাদের স্বার্থের জন্য ভারতকে এখন প্রধানত লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।
দ্বিমেরু বিশ্ব বনাম বহুমেরু ভারত-রাশিয়া
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য ভেঙে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ‘বহুমেরু’ বিশ্ব প্রতিরোধ করতে মরিয়া। তারা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটি ‘দ্বিমেরু’ বিশ্বব্যবস্থা বজায় রাখতে চায়। এই লক্ষ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যৌথভাবে ভারতকে প্রতিহত করার জন্য একটি অলিখিত চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে মনে করা হয়।
তিস্তা ও বেল্ট রোড: যুক্তরাষ্ট্র আপাতত বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি কৌশলগত জোট গঠন করেছে, যা চীনকে এই অঞ্চলে তিস্তা প্রকল্প এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তু করা: এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থগুলো অর্জনের জন্য তারা বাংলাদেশকে একটি প্রধান ‘ঘাঁটি’ বা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে।
জ্বালানি বাজারের নতুন মেরুকরণ এবং ওপেক
বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির আরেকটি প্রধান হাতিয়ার হলো জ্বালানি বাজার। ওপেক একসময় তেল বাজারের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত, কিন্তু এখন তা কমে ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন নিজেদের নির্ধারিত মূল্যে তেল বিক্রি করতে পারবে, যা বৈশ্বিক তেল বাজার নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করবে।
তাইওয়ান ও সেমিকন্ডাক্টর: চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তির কারণ কী?
চীনের সঙ্গে আমেরিকার বর্তমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের অন্যতম কারণ হলো তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। আমেরিকা মনে করে, এই যন্ত্রাংশ ও শিল্পগুলোকে স্থানান্তরিত করতে আরও ৬ থেকে ৭ বছর সময় লাগবে। যেহেতু আমেরিকার অর্থনীতি বর্তমানে চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে, তাই চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো তাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। এই সময়ে তারা মনে করছে, চীনের সঙ্গে একটি নীতিগত চুক্তিতে আসাই শ্রেয়। আরআইসি (RIC): ভারতের টিকে থাকার শেষ উপায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এখন ‘কোয়াড’ থেকে সরে আসা উচিত এবং আরআইসি (রাশিয়া, ভারত, চীন) জোটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ভারত যদি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে পুনরায় জোটবদ্ধ হতে পারে, তবে এই মার্কিন-চীন আঁতাতকে দুর্বল করা সম্ভব। এর ফলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কালোবাজার এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের ওপর ভিত্তি করে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘সন্ত্রাসী ব্যবসা’ দুর্বল হয়ে পড়বে।
চিকেন নেক ও সেভেন সিস্টার্স: নিরাপত্তা ঝুঁকি
র্যাডিসন বৈঠকে শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে আলোচনা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডোরটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই অঞ্চলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে প্রভাব বিস্তারের নতুন মানচিত্র অঙ্কিত হচ্ছে।
উপসংহার: হাতে হাত রেখে এক জটিল ভবিষ্যৎ
দক্ষিণ এশিয়া এখন এক বিশাল দাবা খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। যেখানে পরাশক্তিগুলো পুরোনো শত্রুতা ভুলে নিজেদের স্বার্থে ভারতকে কোণঠাসা করতে হাত মেলাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা কার্যকলাপ দিল্লির জন্য এক অশুভ সংকেত। ভারত যদি দ্রুত তার ‘আরআইসি’ নীতিতে ফিরে না আসে, তাহলে আগামী দিনে এই অঞ্চলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঢাকার সেই গোপন বৈঠকটি শুধু একটি আলোচনা ছিল না, এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী নীলনকশা।
এ কারণেই পল কাপুর বলেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে আমেরিকার শীর্ষ ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে প্রয়োজন… আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের চেয়ে বাংলাদেশকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার অর্থ হলো মিয়ানমার ও ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনা থাকবে…
বাংলাদেশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লবির মাধ্যমে সৌদি আরব এবং অন্যান্য গোল্ড ৬ দেশগুলোতে সৈন্য পাঠাতে চায়… কারণ জাতিসংঘ বাংলাদেশের সৈন্য ফেরত পাঠাচ্ছে… তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সৌদি আরবের সাথে সামরিক ও তেল কূটনীতি ব্যবহার করতে চায়…
যেহেতু সৌদি আরব এবং কুয়েত সম্প্রতি আমেরিকার জন্য নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করেছে, তাই সৌদি আরব আমেরিকানদের পরিবর্তে ১০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য নিয়োগ করেছে… এখানে বাজেট কাটছাঁট এবং যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে বাংলাদেশি সৈন্যদের জাতিসংঘ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে… এ কারণেই বাংলাদেশি সামরিক বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছে, কারণ পাকিস্তানের সৌদি আরবের সাথে চুক্তি রয়েছে, যা অন্যান্য গোল্ড ৬ দেশগুলোকে পাকিস্তান থেকে আরও বেশি সৈন্য নিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে পারে… কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার বেশিরভাগ সৈন্যকে বিদেশে পাঠিয়ে নিজেদের দেশে অরক্ষিত থাকার সামর্থ্য রাখে না, বিশেষ করে যখন পাকিস্তান দুটি ফ্রন্টে যুদ্ধে লিপ্ত (সাথে… আফগানিস্তান ও ভারত)…বাংলাদেশও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল চায়, যেমন পাকিস্তান সৌদি তেল শোধনাগার সুরক্ষা টাস্ক ফোর্সে কাজ করার বিনিময়ে সৌদি অপরিশোধিত তেল পাচ্ছে…
-অধ্যাপক ড. আরিফ
ব্রিটিশ ইকনোমিস্ট এন্ড গেওপলিটিক্যাল ট্রেড এনালিস্ট
ব্রিটিশ ইকোনমিক রিসার্চের
arifrummankhan@gmail.com






