পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ২ জুন ২০২৬ : বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে শতাধিক ব্যক্তিকে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি। এ ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় করা হচ্ছে মাইকিং।
মঙ্গলবার দুপুরে বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির এমন তৎপরতা দেখা যায়।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানান, রোববার দিবাগত রাতে কয়েকটা গাড়িতে করে শতাধিক নারী-পুরুষকে সীমান্তে এনে জড়ো করে বিএসএফ । পরে গভীর রাতে সীমান্ত লাইট অফ করে তারকাটা বেষ্টিত বিভিন্ন গেট খুলে তাদেরকে সাদিপুর সীমান্তের খড়ের মাঠ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালায়।
এসময় টহলরত বিজিবির প্রতিরোধে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। সীমান্তের ২১/৬ পিলারের পাশ দিয়ে ১২ জন নাগরিকে তার কাটার বাইরে ঠেলে দিলেও বিজিবির বাধায় গত ৩ দিন ধরে জিরো লাইনে আটকে আছে তারা। মাঠের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হচ্ছে তাদের।
এছাড়াও সোমবার পতাকা বৈঠকেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে নারী-শিশু ও পুরুষেরা অমানবিক দুর্ভোগে পড়েছেন। সীমান্তে বিজিবি- বিএসএফ ভারী অস্ত্র বসিয়ে রয়েছে মুখেমুখি অবস্থানে। সীমান্তে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা।
সীমান্তে ডিউটিরত বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার সীমান্ত এলাকায় কোনো নাগরিকের অস্তিস্ত পাওয়া যায়নি। তবে সীমান্তে ঝোপ-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকতে দেখেনি তাদের বলে মন্তব্য করেছে বিজিবি সদস্যরা।
এ মানবিক বিষয়ে দু’দেশের সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয়রাও।
এদিকে, ভারতীয় মিডিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের পুশ ব্যাক বা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে মূলত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্তের কথা উঠে এসেছে। এই খবরগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন, চুয়াডাঙ্গা ব্যাটেলিয়নের ৬ বিজিবি অধিনায়ক লে: কর্নেল মো: নাজমুল হাসান। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ”প্রতিবেদনে মুর্শিদাবাদ সীমান্তের কথা বলা হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরের উদৃতি দিয়ে বলা হয়েছে ১ জুন ২০২৬ তারিখে নাকি বিএসএফ ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মুর্শিদাবাদের রানীনগর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের পরিচয় বাংলাদেশি হিসেবে যাচাই করার পর বিএসএফ ও বিজিবির সমন্বয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে হস্তান্তর করা হয়। এই খবরটি সম্পন্নরুপে মির্থা খবর।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকোনোমিক টাইমস অন্য একটি খবর প্রসঙ্গে লে: কর্নেল নাজমুল জানান, উত্তর ২৪ পরগনা বিথারী-হাকিমপুর সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশবিরোধী অভিযানের পর শত শত মানুষ বিথারী-হাকিমপুর সীমান্তের দিকে যেতে শুরু করে। ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে এটিকে স্বেচছায় বাংলাদেশে ফেরত যাচেছ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিপুরা সীমান্ত বিষয়ে ইকোনোমিক টাইমসের রিপোর্ট ২০২২ সাল থেকে ত্রিপুরায় আটক হওয়া বিদেশিদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ছিলেন। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ও ফেরত পাঠানো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা গেছে। ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে পুশ ব্যাক করা হবে বলে হুমকি দেওয়ার পরে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানায়। ভারতের কেন্দ্র সরকারও পরে বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক সরকারি নীতি হিসেবে উপস্থাপন করেনি। হিন্দুস্থান টাইমস একটি খবরে বলেছে, ”বাংলাদেশি সূত্র অনুযায়ী খাগড়াছড়ির পাঁচড়ি, জামিনীপাড়া, খেদাছড়া; মৌলভীবাজারের কিছু এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারী চরাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মন্দারবাড়িয়া এলাকায় জোরপূর্বক লোক পাঠানোর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে”। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বড় অংশে ঘটনাগুলোকে অবৈধ অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ-বিরোধী অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার বলছে, যথাযথ কূটনৈতিক ও যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাক গ্রহণ যোগ্য নয়। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও হয়েছে। এটির কোন নির্ভরযোগ্য সুত্র ছাড়াই খবর করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান লে: কর্নেল মো: নাজমুল হাসান।
লে: নাজমুল ২ জুন আনন্দবাজার পত্রিকার একটি রিপোর্ট উদৃতি দিয়ে বলেন, পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, সোমবারে ৫৫ জনকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে খবরটি সম্পুন্ন মির্থ্যা। রিপোর্টে বলা হয়েছে নথি যাচাই করে বিজিবি’র সঙ্গে বোঝাপড়া করেই পুশ ইন করা হয়েছে এই সব খবরের পিছনে কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতা থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশইন ও পুশব্যাকের বিরোধিতা করছেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত দিয়ে পুশইনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আইনগত নিয়ম মেনে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বর্তমানে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন সরকারের কাছে ঝুলে নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন ৮ জুন নয়াদিল্লিতে শুরু হবে। এই সম্মেলন চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। বিজিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মঙ্গলবার।






