পোবনিউজ২৪, ঢাকা, ২ জুলাই ২০২৬ : ইলিশ মাছ এটি দুই বাংলার বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। একসময় ভরা মৌসুমে পদ্মা-মেঘনার বুকজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বড় ইলিশ ধরা পড়ত, আর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশের ইলিশ পৌঁছে যেত পশ্চিমবঙ্গের ঘরে ঘরে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়ে। কিন্তু এই সময় পদ্মায় বড় ইলিশের সংকট, গবেষণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, সীমান্তে পুশব্যাক, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং কমে আসা ইলিশ রপ্তানি সব মিলিয়ে ম্লান হয়ে পড়ছে দুই বাংলার সেই চিরচেনা রুপালি বন্ধন। এমন সময় প্রায় দুই বছর পর ভারত আবার বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা চালু করায় নতুন করে আলোচনায় উঠেছে প্রশ্ন এ কি দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলার শুরু, নাকি কেবল সাময়িক কূটনৈতিক সৌজন্য?
ইলিশ শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতি বা খাদ্যসংস্কৃতির অংশ নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, নদীমাতৃক জীবনের প্রতীক এবং দুই বাংলার আবেগের এক অনন্য বন্ধন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে “বাংলাদেশে ইলিশ আহরণ ও সংস্কৃতি” জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। এর আগে বাংলাদেশ ইলিশকে ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইলিশকে বিশ্বদরবারে নতুন মর্যাদা দিলেও বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে বড় ইলিশের সংকট এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এক সময় ভরা মৌসুমে পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া কিংবা আড়িয়াল খাঁ নদে জেলেদের জালে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশ ধরা পড়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। নদীর ঘাট, মাছের আড়ত এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে ছিল রুপালি এই মাছের প্রাচুর্য। আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ভরা মৌসুমেও বড় ইলিশের দেখা মেলে কম, আর বাজারে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজানে পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নির্বিচারে মা ইলিশ ও জাটকা নিধন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের অবক্ষয় সব মিলিয়ে ইলিশের জীবনচক্র চাপে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও মাছের আকার—দুই ক্ষেত্রেই।
এই বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে চাঁদপুরের ইলিশ গবেষণা কার্যক্রম। সরকার প্রতিবছর গবেষণা ও সংরক্ষণে অর্থ ব্যয় করলেও মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রভাব কতটা পড়ছে—তা নিয়ে জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। গবেষণার ফলাফল, প্রযুক্তির ব্যবহার, নদী পুনরুদ্ধার, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং জেলে পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবি উঠছে।
ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও এক আবেগঘন অধ্যায়। বহু বছর ধরে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ রপ্তানি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে পদ্মার ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, উৎসবের আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পূজার ভোজে ইলিশ না থাকলে অনেকের কাছেই উৎসব যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ইলিশের সরবরাহ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সীমান্ত পরিস্থিতি, পুশব্যাক, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সীমান্তে পুশব্যাকের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও ইতিবাচক একটি বার্তা এসেছে। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত ২৮ জুন থেকে ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটক (টুরিস্ট) ভিসা প্রদান পুনরায় শুরু করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা চালু হওয়া জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন ও ব্যবসায়িক সফর বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটিকে সম্পর্কের পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণের লক্ষণ বলতে হলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক আস্থার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে হবে। অর্থাৎ ভিসা পুনরায় চালু হওয়া বরফ গলার একটি সম্ভাব্য সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেটি টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে দুই দেশের ভবিষ্যৎ নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব পালন করছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাদেশের ইলিশের আবেদন এতটুকুও কমেনি। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও খাদ্যসংস্কৃতির যে ঐতিহাসিক বন্ধন দুই বাংলাকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে, ইলিশ সেই বন্ধনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমন্বিত মৎস্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এখন বর্ষাকাল চলছে। পদ্মা-যমুনায় পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। নদীতে রয়েছে মাছ শিকারি জেলে নৌকার আনাগোনা। কিন্তু এ দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘশ্বাস এবং হতাশার কালো মেঘ। কারণ, ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত চকচকে রুপালি ইলিশ। সারাদিন নদীতে জাল ফেলে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে জেলেদের জ্বালানি খরচসহ খোরাকিই উঠছে না। হতাশার সাগরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে পদ্মা-যমুনার জেলেরা।






